
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ প্রেসিডেন্সীর প্রাক্তনী নীতিন সিংহানিয়াকে ঘিরে বুক বেঁধেছিলেন মুর্শিদাবাদের যুবকরা। তাঁর লেখা বই পড়েই আইপিএস পরীক্ষায় বসেছিলেন বলে কান্দি বই মেলায় জানিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ। দায়িত্ব নিয়ে জেলার উত্তর থেকে দক্ষিণ, হাসপাতাল থেকে মাঠ সর্বত্র স্বচ্ছতার ডাক দিয়েছিলেন প্রখ্যাত এই আইএএস। জেলাশাসকের পদে বসে খেলার মাঠের পরিকাঠামো বদলে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নীতিন। কিন্তু পাঁচ মাসও গেল না, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আগেই তাঁর হাতে বদলির নির্দেশ ধরিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে কেএমডিএ-র সিইও পদে পাঠিয়ে ভোট বৈতরণী পার করতে তিনি সিনিয়র আইএএস ইঞ্জিনিয়র সুরেন্দ্র কুমার মীনাকে জেলার দায়িত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছেন ।
শুক্রবার জেলা প্রশাসনিক ভবনের ঘরগুলিতে যখন আলো নিভতে শুরু করেছে সোমবারের আশায়, সেই সময় হঠাৎই জেলাশাসকের বদলির নির্দেশে খানিকটা হতভম্বই হয়ে যান আধিকারিক থেকে করণিক সকলেই। দিন কয়েক ধরে জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের রাজ্যের এখানে ওখানে পাঠিয়ে ভিন জেলা থেকে এক ঝাঁক নতুন ও অভিজ্ঞ আধিকারিকদের পাঠিয়ে ঘর গুছোচ্ছিলেন তৃণমূল নেত্রী। তার আগে জেলার দুই এসপিকেই সরিয়ে দিয়েছেন। জেলাশাসককেও রাখলেন না। তাঁর জায়গায় সচিব পদমর্যাদার ওড়িশা ক্যাডারের এক আইএএসকে নিয়ে এসে পাল্টা নির্বাচন কমিশনকেই চ্যালেঞ্জ জানালেন মমতা, বলছেন অভিজ্ঞ আমলাদের কেউ কেউ।
তবে বর্তমান জেলাশাসককে নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না জেলা প্রশাসনের একাংশ আমলা। এমন কথা তাঁর বদলির নির্দেশের পর থেকেই শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে তৃণমূলের একাংশ জেলা নেতারাও তাঁর কাজে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি দলের মধ্যেই বিভেদের কৌশল নিয়েছিলেন, এমন দাবি করছেন কোনও কোনও নেতা। তৃণমূলের বহরমপুর সংগঠনের সভাপতি অপূর্ব সরকার সেই বিতর্কে না ঢুকে বলেন, ” এটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এখানে রাজনীতি নেই।”
প্রসঙ্গত, নীতিনের আগে জেলাশাসক ছিলেন রাজর্ষি মিত্র। শাসকদলের নেতাদের তাঁর ধারে কাছে ঘেঁষতে দিতেন না । নীতিন অবশ্য নেতাদের নিয়েই চলতেন। প্রয়োজনে কাউকে কাছে টেনে কাউকে দূরে ঠেলে ভোট বৈতরণী পার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যে জেলাপরিষদ নিয়ে এতো দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তাঁর বদলির নির্দেশ আসা অবধি সেই দুর্নীতির প্রমাণ বা তদন্ত নিয়ে জেলাশাসক এতদিনেও কোনও নির্দেশ দেননি। উল্টে দোষীদের আশ্রয় দিয়েছেন বলে দাবি করছেন তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফেরা জেলা পরিষদের প্রবীণ সদস্য শাহনাজ বেগম।
নির্বাচনী আবহে তাঁর বদলির নির্দেশ এলেও বেলডাঙা কাণ্ডের পরেই তাঁর ঠিকানা পাল্টে যেতো বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ। সেদিন দিনভর উত্তাল বেলডাঙাকে যারা অশান্ত করলো তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টে সহানুভূতি দেখিয়ে বিক্ষোভ থামানোর চেষ্টা করেছিলেন জেলার দুই মাথা পুলিশ সুপার ও জেলাশাসক। পড়ন্ত বিকেলে ঘটনাস্থলে তাঁদের বক্তব্য নিয়ে অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল অবরোধে আটকে থাকা সাধারণ মানুষের মনে। কিন্তু জেলাশাসকের মুখ পুড়িয়ে পরের দিন ফের বিক্ষোভে তপ্ত হয়েছিল বেলডাঙা। এনআইএ-র তদন্ত চলছে সেই ঘটনার। যা রাজ্য সরকারের কাছে লজ্জার বলে দাবি করেছেন আমলাদের একাংশ। এসআইআরের কাজেও বারবার মুর্শিদাবাদ সংবাদ শিরোনামে এসেছে নীতিনের আমলেই। ১১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়াকে ভালোভাবে নিতে পারেননি কোনও রাজনৈতিক দলের নেতারা।
মুর্শিদাবাদে বহু নামি আমলা জেলাশাসকের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন। কেউ জেলাকে এগিয়ে দিয়েছেন। কেউ আলগা থেকেছেন চাকরি বাঁচাতে। মনোজ পন্থ থেকে হরিকিষণ দ্বিবেদী সুনামের সঙ্গে এতবড় জেলা চালিয়েছেন। বর্তমান স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশ প্রসাদ মিনাও কোভিড কালে জেলাশাসকের দায়িত্বে ছিলেন। মালদহ থেকে এসে জেলার দায়িত্ব নিয়ে ২০২৫ এর অক্টোবরে এসেছিলেন নীতিন সিংহানিয়া। সাধারণ মানুষের ঘরের মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টায় খুশি ছিলেন জেলাবাসী। জেলার উন্নতি নিয়ে যখন স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা সেই সময় তাঁর বদলির নির্দেশ এলো। মুর্শিদাবাদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক বিশ্বজিৎ ভাদুড়ী বলছেন, ” প্রতিশ্রুতির খাতায় পাতার টান পড়লো কিন্তু বাস্তবায়ন হলো না কিছুই।”