
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ তৃণমূলের প্রাক্তন পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নাম রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছেন বিজেপি’র অমিত শাহ। নাম ঘোষণা হওয়া ইস্তক মুর্শিদাবাদের আনাচে কানাচে রাজনৈতিক দলগুলির কাছ থেকে ভেসে আসছে পক্ষে বিপক্ষের মত। বিজেপি’র মধ্যেও দুটি মত ঘুরছে। একটা অংশ শমীক ভট্টাচার্যকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন অন্য অংশ অবশ্য খুশি শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায়। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও তৃণমূলও গা ভাসাচ্ছে এই ইস্যূতে।
রাজ্যে পালাবদলের পর শুভেন্দু পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন মমতার মন্ত্রীসভায়। তারপর দলের পক্ষ থেকে তিনি হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার পর্যবেক্ষক। মমতা সরকারের দ্বিতীয় বছরে তৃণমূলে শুভেন্দু তখন গনগনে সূর্য। কংগ্রেসের গড় মুর্শিদাবাদকে রাজনৈতিক কৌশলে গুঁড়িয়ে দিলেন চোখের নিমেষে। কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে অর্থ দেখিয়ে কংগ্রেস, সিপিএমের মতো দলের প্রতীকে জেতা জনপ্রতিনিধিদের একটা একটা করে তাঁর মুঠোয় নিয়ে আসেন।
সেই কংগ্রেসের ঘরে আজ যেন ফিল গুড হাওয়া। সমাজমাধ্যমে শুভেন্দুর ছবি শেয়ার করে শুভেচ্ছা জানাতে ব্যস্ত তাঁরা। শহর কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পিনাকী সরকার তাঁর ফেসবুকের দেওয়ালে লিখেছেন ” জোর করে একজনের পছন্দের শ্লোগান জয় বাংলা শব্দটি শুনতে হবে না।” শুধু পিনাকী নন, কংগ্রেসের একাধিক পেজে কোথাও কোথাও অধীর চৌধুরীর নামও জুড়ে আছে যেখানে, সেখানেও শুভেন্দুকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। পিনাকী অবশ্য বলেন, ” আমরা হেরেছি নির্বাচনে। আর আজ যদি তৃণমূল জিততো তাহলে আমাদের ঘর থেকে বেড়নো বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু বিজেপি জিতেছে বহরমপুর। এখনও কোনও অসুবিধা আমাদের হয়নি। আমরা তৃণমূলের হাতে অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত হয়েছি বারবার। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছি বলেই লিখেছি।”
২০১৬ থেকে ২০২৬। পদ্মা দিয়ে গড়িয়ে গিয়েছে কত জল। শুভেন্দুও তৃণমূলে থাকেন নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি তাঁর ছায়ায় থাকা তৃণমূলের সেই সব নেতাদের। পদ্ম শিবিরে ঢুকে সংখ্যালঘু অধূষ্যিত মুর্শিদাবাদে শুভেন্দু দল ভাঙানোর চেষ্টা করেননি। কিন্তু আজ তাঁদের প্রিয় ‘দাদা’ রাজ্যের দায়িত্ব নিতে যখন প্রস্তুত তখন তারজন্য ঈশ্বরের কাছে কেউ চাইছেন দোয়া, আশীর্বাদ কেউ জানাচ্ছেন নিঃস্বার্থ শুভেচ্ছা।
শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ নওদার তৃণমূল নেতা মোশারফ হোসেন সরকার ওরফে মধু , শুভেন্দুর হাত ধরে কংগ্রেসের জেলা পরিষদ দখল করেছিলেন ২০১৬ সালে। পরে তৃণমূল শুভেন্দু যখন বিদ্রোহী, মধুর গলাতেও ছিল ক্ষোভ। ২০২০ সালে শুভেন্দু যখন ঘাসফুলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, মধুও সেই পথ অনুসরণ করেন। শুভেন্দু যান বিজেপিতে। মধু ফেরেন কংগ্রেসে। এদিন মধু বলেন, ” দু-জনে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি। ভাল লাগছে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। আজ রাজনৈতিকভাবে দু’জনে দুই পৃথক মতাদর্শে বিশ্বাস রাখলেও তাঁকে আমার শুভেচ্ছা জানাই।” কী মনে হচ্ছে দ্বিতীয়বার কংগ্রেসে ফিরে না গিয়ে বিজেপিতে যোগদান করলে ভাল হত? তিনি বলেন, ” আমি ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই শুভেন্দু দাও আমাকে বিজেপিতে যেতে বলেননি। আমিও আগ্রহ দেখাইনি। যেখানে আছি সেখানেই ভাল আছি। তবে তাঁর সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।”
শুধু মধু কেন ? জঙ্গিপুরের বিকাশ নন্দ থেকে আনারুল হক বিপ্লব সকলেই ছিলেন শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ। তাঁরাও শুভেন্দুকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিকাশ নন্দের স্ত্রী তৃণমূলের কাউন্সিলর। তাঁকে শুভেন্দু একসময় ডেকেছিলেন বিজেপিতে। কিন্তু সেদিন তিনি যাননি। মেদিনীপুরের এই ভূমিপুত্র আজ বলেন, ” আমি সেদিন যাইনি। কিন্তু এটা ঠিক শাসকদল সঙ্গে থাকলে মানুষের কাজ করা সম্ভব। শুভেন্দু দাও মানুষের জন্য কাজ করবেন বলে বিশ্বাস।”
মুর্শিদাবাদ আসনে পরপর দু’বার পরাজিত প্রার্থী শাওনী সিংহরায়ও তৃণমূলে ভিড়েছিলেন শুভেন্দুর হাত ধরে। এদিন তিনি অবশ্য বিতর্ক এড়াতে এড়িয়ে গিয়েছেন প্রশ্ন। আজ যিনি তৃণমূলের জেলা সভাপতি সেই অপূর্ব সরকার, জঙ্গিপুরের সুনীল চৌধুরী, রবিউল আলম চৌধুরী শুভেন্দুর হাত ধরেই ঘাসফুল শিবিরে প্রবেশ। আজ তাঁদের অনেকেই ঘনিষ্ঠ মহলে তৃণমূলকে দুষে নিজদের সিদ্ধান্তকে দোষারপ করছেন।