
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বহরমপুর: নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল তখনও বাকি। বহরমপুর গার্লস কলেজ এলাকায় তখন নেতার জয় নিশ্চিত ধরে পৌঁছে গিয়েছেন তাঁর অনুগামীরা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কারও কারও মনে তখনও দ্বিধা। সময়ের খেলায় দম ধরে আছেন সুব্রত মৈত্রও। কখন কি ঘটে যায় তাই, শংসাপত্র হাতে না পাওয়া অবধি অপেক্ষা করেছেন। শেষতক জয়ের হাসি হেসেছিলেন বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক দ্বিতীয়বার। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা যাদের মনেও সন্দেহ ছিল সুব্রত’র জেতা নিয়ে, তাঁরাও সেখানে এসেছিলেন বাধ্য হয়েই। কারণ, বিজেপি’র রাজ্য জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল বহরমপুর বিধানসভা। সেই সংবাদমাধ্যমকে দুষে কাঞ্চন ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন সেই সব সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে ক্যামেরার সামনে।
জয়ের পর চব্বিশ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। সুব্রত এখন বিজেপির ব্যস্ত বিধায়ক। ‘নাওয়া খাওয়ার সময় পাচ্ছি না।’ বলে ঘনিষ্ঠ মহলে দাবিও করেছেন তিনি। পাঁচ বছর আগে মুর্শিদাবাদ তো বটেই, রাজ্যবাসীকে অবাক করে বহরমপুর আসন বিজেপি পেয়েছিল সুব্রতর সৌজন্যে। সেই সময় তৃণমূলের একজন পঞ্চায়েত সদস্যের বক্তব্যের যে দাম ছিল এক শ্রেণীর স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম তো বটেই মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের একাংশের কাছেও সেই দামটুকু ছিল না বিধায়ক কাঞ্চনের। দ্বিতীয়বার তাঁর ভোটে জেতা ও রাজ্যে পালাবদলের পর সেই সংবাদমাধ্যমের আলো বহনকারীরা ফুরসৎ পাচ্ছেন না, বিধায়কের মতোই, পাছে কেউ ব্রেকিং দিয়ে ফেলে এইভেবে। অথচ নির্বাচনচলাকালীন ও বহরমপুরে সংবাদমাধ্যমের কাঞ্চন প্রসঙ্গে ভূমিকা ছিল নেতিবাচক।
একথা বললে ক্ষুব্ধ হবেন মুর্শিদাবাদের সংবাদমাধ্যমের পরিচালকদের একাংশ। তা জেনেও বলছি, প্রথমসারির ওই সংবাদমাধ্যমদের একটা বড় অংশের সময় কেটেছে বহরমপুর পৌরসভার অলিন্দে, তবু মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের চ্যানেলে বা কাগজের মূল অংশে পুরসভার চেয়ারম্যানের মুখ দেখাতে অন্তত নব্বই ভাগ বা তার বেশি ক্ষেত্রে অসমর্থ হয়েছেন তাঁরা। এমনকি কেউ চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হিসেবে কেউ অধীর চৌধুরীর উপদেষ্টা হিসেবে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন নির্বাচনের আগে এমনটাই জানা গেছে। কাগজপত্রে তার প্রমাণ না মিললেও খবরগুলো দেখলেই দর্শকরা সে কথা বুঝতে পারবেন।
বহরমপুরে বাস করার সুবাদে যতটুকু জানি, সুব্রত বিরোধী প্রচারের কৌশলও নিয়েছিলেন সংবাদমাধ্যমের এই অংশ। সেই তাঁরাই নির্বাচনের পর আজ হৈ হৈ করে সুব্রত মৈত্রের গান গাইছেন, যেমন শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর দলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তৃণমূলের জোব্বা পরা মানুষগুলো।
ইদের শুভেচ্ছা জানাতে আজ শুধু নয়, সমাজকর্মী কাঞ্চন বরাবরই তাঁর এলাকায় যান। অনেকেই আসেন তাঁর ডেরায়। তাঁর সঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সম্পর্ক বিধায়ক হিসেবে নতুন নয়। অথচ আজ সেটাও খবর।
বিজেপি নেতা হিসেবে কাঞ্চন কতখানি হিন্দু নেতা হতে পারলেন। কিংবা মুসলমানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে কোন শীতলতা এল কি না বরং সেটাই ছিল খবর। ডিজিটাল যুগে ভিডিও প্রচার অর্থ রোজগারের আসল উপাদান। আবার সেই ভিডিওকে অর্থের বিনিময়ে প্রচার করাও কৌশল। রোজগার যেখানে প্রশ্ন, সেখানে খবরের বিশ্লেষণ আত্মঘাতীর নামান্তর ছাড়া কিছুই নয়।
তবে সংবাদমাধ্যমের আলোকে ব্যবহার করাও একটা কৌশল। সংবাদমাধ্যম স্বার্থ অনুযায়ী যদি বিধায়ককে ব্যবহার করেন সাংবাদিকরা তাহলে বিধায়কেরও সেই পথ অবলম্বন করা উচিত। ভূলে গেলে চলবে না, নাড়ুগোপাল, অপূর্ব সরকার কিংবা জাকির হোসেন, আজ তারা নেই কোনো খবরে। যেদিন এঁদের একটা বড় অংশ বিজেপির নামাবলী গায়ে চাপাবে সেদিন সংবাদমাধ্যমের আলো সুব্রতর ওপর থেকে সরে যাবে না তো? তাঁর মতো মানুষের চলার রাস্তায় গর্ত খোঁড়া হবে না তো রাজনীতিতে সব হয় বাক্যের প্রয়োগে। রাজনীতিতে ভালো মানুষের অভাব কিন্তু বুঝিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। সংবাদমাধ্যমেও বেনোজল ঢুকেছে ওই আমলেই।
(লেখক পেশায় শিক্ষক, মতামত ব্যক্তিগত)