
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠক শেষ হওয়ার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের সাধারণ বৈঠক হয়ে গেল শনিবার। জেলাপরিষদের প্রায় সব সদস্যই এদিনের বৈঠকে হাজির ছিলেন। বৈঠক ঘিরে ছিল ফিল গুড হাওয়া। এমন বৈঠক তৃণমূলের আমলেও কেউ দেখেননি বলে দাবি করলেন সদস্যদের কেউ কেউ। এদিনের বৈঠকে সিপিএম, কংগ্রেসের সদস্যরা তো ছিলেন সদ্য তৃণমূল ত্যাগী জেলার দুই সাংসদ আবু তাহের খান, খলিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএমের নব নির্বাচিত বিধায়করাও ছিলেন। তাঁদেরকে সম্মান জানানো হয় জেলাপরিষদের পক্ষ থেকে।
জেলা পরিষদের বৈঠকে রাস্তা, ঘাট, পানীয় জলের ব্যবস্থা সবকিছু নিয়ে যেমন আলোচনা হয় সাধারণত এদিন তেমনই একটি স্বাভাবিক বৈঠক হয়েছে। কখনও বিজেপি, কখনও কংগ্রেসের নির্বাচিত সদস্যরা জেলা পরিষদের আওতাধীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অচলাবস্তা কাটানোর দাবি করেছেন। কখনও উত্তরবঙ্গ বাস টার্মিনাস লাগোয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ডায়াগোনস্টিক সেন্টার নিয়ে কথা বলেছেন। আর এই সব দাবি নিয়ে তাঁরা সভাধিপতির কাছেই কৈফিয়ত চেয়েছেনে।” সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানাও বলেন, ” সরকারের কাজ আমাদের করতে হবে। সেই মতো বৈঠকে জেলার উন্নয়ন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে সদস্যদের সঙ্গে।”
মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনের পর্যালোচনা বৈঠক শেষে জেলা পরিষদের দুর্নীতি নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন এদিন সভাধিপতি সেই দাবি উড়িয়ে পাল্টা আধিকারিকদের ঘাড়ে সেই দোষের বোঝা চাপিয়েছেন। বিজেপি সরকার পরিচালনা আসায় তাঁরা ডাক পাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র। তিনি বলেন, “এদিনের বৈঠকে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এক আদালতের জটে আটকে থাকা কলেজ ও অচলাবস্থায় থাকা রবীন্দ্রনাথ ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে জেলাপরিষদের চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
আর এসবের পরে জেলা পরিষদের চৌহদ্দিতে সব থেকে বেশি ঘুরপাক খেয়েছে যে প্রশ্ন তা হল সভাধিপতি এখন কোন দলের? তা নিয়ে না কি ধন্দে পড়েছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। খোঁচা দিয়েছেন বিরোধীপক্ষরাও। সাধারণত দলমত নির্বিশেষে জেলা পরিষদ কোনও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়। গ্রাম বাংলার উন্নয়নের চাবিকাঠি এই পরিষদের হাতেই। কিন্তু ২০১৬ সালের মাঝপথে কংগ্রেসকে সরিয়ে তৃণমূল জয়ী জনপ্রতিনিধিদের নিজের দলে টেনে নেয়। পরের দুটি নির্বাচন ২০১৮ ও ২০২৩ সালে ও তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ায় মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ তৃণমূলের দখলেই থাকে। কিন্তু চলতি বছর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জেতা ইস্তক তৃণমূল দল ক্রম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আজ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে প্রায়।
জেলায় তৃণমূলের টিকিটে জেতা দশজনের মধ্যে ন’জনেই ঋতব্রত তৃণমূলে নাম লিখিয়েছেন। তিন সাংসদ এনসিপিআই দলের সদস্য বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। এই অবস্থায় আদি তৃণমূল সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। মস্করাও উড়ছে জেলা পরিষদের অলিন্দে। ইতিমধ্যে ঋতব্রত তৃণমূল দুই জেলার একটিতে ইমানি বিশ্বাস আর একটিতে অপূর্ব সরকারকে দলের ভার দিয়েছে। সূত্রের দাবি, দুই নেতাই জেলাপরিষদের সদস্যদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করছে। সেই প্রস্তাব ও এসেছে নির্বাচিত সদস্যদের কাছে। যাঁদের একটা অংশ সেই স্রোতে গা ভাসাতে নারাজ। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়ে আদি তৃণমূলের টিকিটে জেতা জনপ্রতিনিধিরা। সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানাও ব্যতিক্রম নয়। যদিও তাঁকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,” এই উত্তর আমার জানা নেই”। এক অভিজ্ঞ সদস্য বলেন,” আমরা নিজেরাও জানি না আমরা কোন দলের? ” জেলা পরিষদের সদস্য তজিমুদ্দিন খান বলেন, ” আড়াই বছর কেটে গেল, বাকি আড়াই বছর কোনো দলের হয়ে নয়, সাধারণ মানুষের জন্য, এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করে যেতে চাই।”
বিজেপি সরকারে আসার পর মুর্শিদাবাদের একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান যাঁরা তৃণমূলের প্রতীকে জিতেছিলেন, তাঁরা পদত্যাগ করেছেন। বহরমপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাধিপতি আইজুদ্দিন মন্ডলও পদত্যাগ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই নিচুতলায় উন্নয়ন পৌঁছে দিতে অসুবিধা হচ্ছে। ধাক্কা খাচ্ছে সরকারি প্রকল্পের কাজ। একই পরিস্থিতি জেলাপরিষদে শুরু হলে এই মূহুর্তে সংকট দেখা দেবে প্রশাসনে। আবার জনপ্রতিনিধিদের দল বদল করে বিজেপিতে আনতেও চাইছেন না শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্যরা। তাই বোর্ড ভাঙার থেকে নরমে গরমে পুরনো বোর্ডকে দিয়েই আগামী ২৩ মাসে সরকারি কাজ যাতে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় সেই কৌশল নিয়েই এগোতে চাইছে বিজেপি সরকার। এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।