সরকারি কর্মী অভাবে সংকটে কালেক্টরেট ক্লাবও

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ সরকারি কর্মী সংকটে ভুগছে বহরমপুর কালেক্টরেট ক্লাব। দিন দিন কমছে সদস্য সংখ্যা। যা জোরাল করছে বিরোধীদের সরকারি দফতরে কর্মী নিয়োগের দাবি। হাজার দু-হাজার থেকে ক্লাবের সদস্য সংখ্যা এখন একশো থেকে বড়জোর দেড়শোয় দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কমছে চাঁদা। দেখা দিচ্ছে আর্থিক ঘাটতি। তা মেটাতে চড়ছে হল ভাড়া। তৈরি হয়েছে ক্যাফেটেরিয়াও। বন্ধের মুখে বহু প্রশংসিত ক্লাবের পাঠাগারও।

নিয়োগ কোথায় ? এই প্রশ্নে বিরোধীরা নিরন্তর বেঁধে সরকারকে। তাদের অভিযোগ, সরকারি দফতরে স্থায়ী কর্মী নেই, প্রশাসন চলছে ঠিকে কর্মী দিয়ে। নবান্ন থেকে জেলা সর্বত্র ছবিটা একরকম। রাজ্যের পালাবদলের ১৩ বছর পর দিন যত কাটছে ততই বাড়ছে কর্মী সংকট, আর সত্যি হচ্ছে বিরোধীদের দাবি।

সামগ্রিক এই চিত্রের একটুকরো উদাহরণ, মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন। এই প্রশাসনের কাজে যুক্ত সমস্ত স্তরের স্থায়ী সরকারি কর্মী ও আধিকারিকদের নিয়ে ১৯৫৫ সালে তৈরি হয়েছিল কালেক্টরেট ক্লাব। বর্ষবরণ থেকে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এমনকি সংকট কালে রক্তদান শিবিরের আয়োজন, সবেতেই এই ক্লাবের ভূমিকা শহরবাসীকে একসময় আকৃষ্ট করেছিল। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমাজে একটা ছাপ রেখেছিল এই ক্লাব। সেই ক্লাবের বর্তমান পরিচিতি ঠেকেছে শুধু অডিটোরিয়ামেই।

অথচ এই ক্লাব সদস্যদের উদ্যোগেই এখানে তৈরি হয়েছে পাঠাগার। সেই পাঠাগারে একজন গ্রন্থাগারিকও আছেন। কিন্তু পাঠকের অভাবে মলিন পাঠাগারও। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী তথা নাট্য পরিচালক বাচিক শিল্পী অভিজিৎ সরকার বলেন, ” এই পাঠাগার থেকে নিয়মিত বই সংগ্রহ করতেন ক্লাবের সদস্যরা। আমরা যখন চাকরিতে ঢুকি তখন এখানে পাঠকের ভিড়ও হতো। সদস্যদের ছেলেমেয়েদের জন্য পাঠাগারের একটি অংশে ছিল কিশোর পাঠাগারও। ছেলেমেয়েদের বই নেওয়ার ধুম ছিল সেখানেও।” এই ক্লাবের সামনেই ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্টে শীত সন্ধ্যায় খেলতে আসেন স্থায়ী কর্মীরা, আসেন ঠিকে কর্মীরাও। সেখানেও উধাও চেনা ভিড়।

একসময় ক্লাবের দোতলার হল ঘর অল্প পয়সায় ভাড়া পাওয়া যেত বলে শহরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির পাশাপাশি বেশ কিছু সংস্থার ছোটোখাটো অনুষ্ঠানও হত নিয়মিত। এখনও হয়। পুরনো ক্লাব বিল্ডিংয়ের পাশে তৈরি হয়েছে ১৬৮ আসনের নতুন অডিটোরিয়ামে। ওই অডিটোরিয়ামের শিলান্যাস করেছিলেন ষষ্ঠ অর্থ কমিশনের নয়া চেয়ারম্যান রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী ৷ বিধায়ক ও সাংসদ তহবিলের টাকায় তৈরি হয়েছে এই হল, যদিও এখনও তা সম্পূর্ণ হয়নি বলে জানান ক্লাবের বর্তমান সভাপতি দিব্যজ্যোতি সরকার। ভাড়া হাজার তিনেক হলেও সেখানেও ভিড় হয় নিয়মিত। দিব্যজ্যোতি অবশ্য বলেন, ” ভাড়া অন্য যে কোনও হলের তুলনায় কমই।”

এই অডিটোরিয়ামের ভাড়ায় যে আয় হয়, তা দিয়েই ক্লাবের রক্ষণাবেক্ষণ হয়। সর্বক্ষণের তিন জন কর্মীও আছেন সেই জন্য। ২০২৪ সালেই অডিটোরিয়াম ও পুরনো ক্লাব ভবনের মাঝখানের ফাঁকা অংশে চালু হয়েছে ক্যাফেটেরিয়া। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক রেঁস্তোরা নেই প্রশাসনিক ভবনে। তাই কালেকটরেট ক্যাফেটেরিয়া তৈরি বলে জানান দিব্যজ্যোতি।

অবসর প্রাপ্ত আর এক সরকারি কর্মী তথা বাচিক শিল্পী মৃণাল রায় বলেন, ” যখন আমি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম তখন এই ক্লাব জমজমাট ছিল। আর যখন অবসর নিলাম তখন সেই ছবি না থাকলেও ক্লাবের সদস্য সংখ্যা আজকের মতো তলানিতে ঠেকেনি।” ২০০৯ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন মৃণাল।

অভিজিৎ, মৃণাল ছাড়াও এই ক্লাবের সদস্য ছিলেন অভিনেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য, তন্ময় সান্যাল, অলোক মৈত্র, সঙ্গীত শিল্পী শ্যামল সেনগুপ্ত সহ জেলার সাংস্কৃতিক জগতের একাধিক দিকপাল। তারও আগে সুজন ভট্টাচার্য, প্রতীক গুপ্তদের মতো অভিনেতাদের অভিনয় দেখেছে এই কালেক্টরেট ক্লাবে। এই ক্লাব থেকে একাঙ্ক নাটকের প্রতিযোগিতা হত একসময়।

চলতি মাসের ১৮ তারিখ কলকাতায় “নেশা নয়। চাকরি দাও” শ্লোগান তুলে রাজভবন অভিযানের ডাক দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব কংগ্রেস কমিটি। সেখানেও যুব নেতারা কেন্দ্র ও রাজ্যে শূন্য পদে নিয়োগ ও বেকারের চাকরির দাবি তোলেন। ডিওয়াইএফআই বেকারদের কাজের দাবিতে পথে নেমে আন্দোলন করছে জেলায় জেলায়। একই দাবিতে সোচ্চার এসইউসিআই সহ রাজ্যের শাসক বিরোধী সব রাজনৈতিক দলই। এমনকি অতিরিক্ত বোঝা নেওয়ার অভিযোগ তুলে কর্মীহীন দফতরে নিয়োগের দাবিতে সরব শাসকপন্থী কর্মী সংগঠনও।

প্রসঙ্গত, তৃণমূলের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ” শিক্ষক নিয়োগ কী দুর্গা পুজো ? যে বছর বছর নিয়োগ করতে হবে।” সেই সরকারের আমলেই রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডের শুনানিতে শীর্ষ আদালতে জেরবার সরকার। স্কুলে স্কুলে শিক্ষকের ঘাটতি। স্বাস্থ্যেও তথৈবচ। সর্বত্র চুক্তি ভিত্তিক কর্মী দিয়ে চলছে কাজ, তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সেই ভাটা কেটে জোয়ার আসুক কর্মী নিয়োগে চাইছেন বহরমপুর কালেক্টরেট ক্লাবের সদস্যরাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights