
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ ” চীনের প্রাচীর যখন শেষ হল সেই সন্ধ্যায় কোথায় গেল রাজমিস্ত্রিরা?/ জয়তোরণে ঠাসা মোহনীয় রোম।/ বানালো কে? কাদের জয় করল সিজার?” পড়তে জানে এমন এক মজুরের প্রশ্ন।.জার্মান কবি বের্টোল্ট ব্রেশ্টের এই কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। মজুর পড়তে জানে বলেই সে প্রশ্ন করে। যে প্রশ্ন করে সে জানতে চায়। উল্টোটাও হতে পারে, জানে বলেই প্রশ্ন করে। এখানেই বই পড়বার সার্থকতা।
“ভুখা মানুষ ধরো বই, ওটা তোমার হাতিয়ার।” ব্রেশ্টের কথা একসময় শ্লোগান হিসেবে শোনা যেত বহুতলের কুঠুরি থেকে নিম্নবিত্তের কুপি জ্বলা ঘরেও। একটা সংস্কৃতি ছিল বই পড়ার। পাড়ায় পাড়ায় ছিল লাইব্রেরি। ছিল একটা মধ্যবিত্তের দুপুর। বইপড়ার দুপুর। একটা অজানা বিষয়কে জেনে নেবার জন্য বই ঠেক হয়ে উঠতো চায়ের দোকান, নাটকের মহলা কক্ষ, ইউনিয়ন রুম, কলেজ ক্যাম্পাস। সে দিন গিয়েছে। পাঠকের অর্ডার করা পুরনো বই, নতুন বই জোগান দিতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠলেও বইয়ের দোকানদারের সঙ্গে পাঠকের ছিল নিবিড় যোগ। গড়ে উঠেছিল বইপাড়া। ধরা পড়ত বই চোরও। হাতের কাছে ইন্টারনেট এসে গুলিয়ে দিল সব। মুঠো ফোনে দিন বদলালো।
‘বই ধরো, বই পড়ো’ নতুন শ্লোগানে বই ধরলো সবাই ঠিকই, পড়ল না তাদের অনেকেই। বই চলে গেল মুষ্টিমেয় পাঠকের কাছে। দাম চলে গেল সাধারণের নাগালের বাইরে। বই ছাপানো নিয়ে প্রশ্ন উঠল। ছাপা বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠল। লেখকের মান কমলো। নামও হারালো। লেখকের বইয়ের বদলে ব্যক্তি লেখক চলে এলেন আলোচনায়। বইয়ের বাজার ফুরিয়ে এল। ক্ষয়িষ্ণু হয়েও তবু বই বেঁচে আছে। ভরসা এটাই। সেই ভরসায় বাতাস দিল ‘পরের পৃষ্ঠা’। মধ্যবয়সী জনা পাঁচেক মাস্টারমশাই এক ফালি ‘বই ঠেক’-এ টেনে নিয়ে গেলেন জনা পঞ্চাশেক বহরমপুরবাসীকে। নিম্নচাপের মেঘ সরে যেতেই ভ্যাপসা গরমে ভিজে যাচ্ছে শার্ট, শাড়ি। তবু মননশীল পাঠক শুনে যাচ্ছেন ঘরের ছেলে অধ্যাপক মনন কুমার মন্ডলের বলে যাওয়া কথাগুলো।
তাঁর সামনে বসে আছেন অধ্যাপক আবুল হাসনাতের মতো পন্ডিত মানুষ। মনন ছুটে চলেছেন এক রাস্তা থেকে আর এক রাস্তায়। এক অধ্যায় থেকে আর এক অধ্যায়ে। পেঁয়াজেের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে পৌঁছে যাচ্ছেন সেই সব দিনগুলোতে। সেই বেড়া ডিঙোনো অধ্যায়ে। শুনছেন। সকলেই মনোযোগী (?), কোনো উদ্রগ্রীব শ্রোতা মননের সঙ্গে পথ চলছেন মাথা গুঁজে, একমনে। মনন আলোচনা করছেন বর্তমান সময়ের লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর সাহিত্য অকাদেমি পাওয়া ‘জলের উপর পানি’ উপন্যাস। না, পাতার পর পাতা পড়ে চরিত্রের বিশ্লেষণ নয়, তিনি সুতো জুড়ে জুড়ে শ্রোতাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন উপন্যাসের সারকথা। তুলে আনছেন দেশ ভাগের কথা। সন্দীপন মজুমদার বলছেন, ” এ তো রীতিমতো উচ্চমানের আলোচনা। বহুদিন এমন উচ্চ মার্গের আলোচনা শুনিনি।”
পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই নিয়ে এমন আলোচনার আসর মানুষের মধ্যে জুলাইয়ের এক সন্ধ্যায় হঠাৎ একটা খুশির ঝলক এনে দেবে, মাস খানেক আগেও বুঝতে পারেন নি “পরের পৃষ্ঠা” আয়োজক শমীক মন্ডল, মুর্শিদা খাতুন, পঙ্কজ মন্ডল, সৈয়দ তৌফিক, তপন সামন্তরা। মুর্শিদা ঠিকই বলেছেন ” পরের পৃষ্ঠা এই শব্দটির মধ্যে আপনারা একটি দিগন্ত খুঁজে পাবেন। একটা সীমাহীন পথ চলার গন্ধ পাবেন।”
তবে এইরকম বই নিয়ে আলোচনার আয়োজন বহরমপুরে আগেও করেছেন ‘ছাপাখানার গলি’ কাগজের সম্পাদক দেবাশিস সাহা। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সেই পাঠচক্রও বসত শহরের আনাচে কানাচে। সন্দীপন বললেন, ” পরের পৃষ্ঠা ছিন্ন হয়ে যাওয়া সম্পর্কের যোগসূত্র।” শনিবার ১২ জুলাই পরের পৃষ্ঠার বই ঠেকে হাজির ছিলেন দেবাশিসও। তিনি অবশ্য বললেন, ” বইয়ের আলোচনা হয়নি, হয়েছে দেশভাগের আলোচনা, সেই বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছি।” দিনের শেষে একটা প্রশ্নও উঠেছে এদিনের শ্রোতাদের মনে। বইয়ের পাঠক, না কি পাঠকের বই হয়ে উঠবে পরের পৃষ্ঠা। আয়োজকরা অবশ্য বলেছেন ” নজর রাখুন পরের পৃষ্ঠায়।”
খুব ভালো একটা রিপোর্ট। টীম পরের পৃষ্ঠা র রফ থেকে ধন্যবাদ।