প্রায় দশ বছর ধরে মুকেশ কুমারের নজরেই মুর্শিদাবাদ

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ মুর্শিদাবাদ-জঙ্গিপুরের আইজি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আইপিএস মুকেশ কুমার। সেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সমাজমাধ্যমে উল্লসিত একাংশ, তেমনি সমালোচনায় মুখর অন্য একটি অংশও। রাজনীতির অলিন্দেও বিষয়টি নিয়ে রয়েছে পক্ষ-বিপক্ষ শিবির। স্বাভাবিকভাবেই যা বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনী হাওয়ার বেগ বাড়িয়েছে।

বিধাননগরের সিপি থেকে মুকেশ কুমারকে মুর্শিদাবাদের দুটি পুলিশ জেলার আইজি করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন। এই মাসের চার তারিখ তিনি জেলায় আসছেন।পুলিশের একাংশের দাবি, আইজি-র কার্যালয় হিসেবে সেজে উঠছে পুলিশ গেস্ট হাউস “স্বপ্ন নীড়।” ২০১৬ সালের অগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার হিসেবে জেলায় দক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেন এই আইপিএস। পরে পদোন্নতি হওয়ায় তিনি নদিয়া-মুর্শিদাবাদের দায়িত্ব পান ডিআইজি হিসেবে। কিন্তু হিসেব বদলে যায় ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর।

পরে ডিআইজি হিসেবে তিনি ফের মুর্শিদাবাদের দায়িত্ব পেলেও ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের সময় তাঁকে সরিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। আর সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, মুর্শিদাবাদে অশান্তি ছড়ালে কমিশনের অফিসে ধর্নায় বসবেন তিনি। বেলডাঙার হিংসার ঘটনাই হোক আর ওয়াকফ সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে উত্তালই হোক উত্তর মুর্শিদাবাদ, জেলায় যখনই আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে তখনই সেই মমতার ভরসার সেনাপতি হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন মুকেশ। হয়েছেন সরকারের ব্লু আইড বয়। স্বাভাবিকভাবেই গত দশ বছর ধরে মুকেশ কুমারের চোখের নজরেই রয়েছে মুর্শিদাবাদ। যে সময়টা রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে মুর্শিদাবাদে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই জেলায় তৃণমূলের পালে হাওয়া লাগে। তাঁকে তৃণমূলের ‘জেলা সভাপতি’ হিসেবেও সেই সময় খোঁচা দিতেন বিরোধীরা। এমনকি জেলা থেকে ভিন জেলায় চলে গেলেও তৃণমূল নেতাদের একটা বড় অংশের সঙ্গে মুকেশ কুমারের যোগাযোগ আজও বিচ্ছিন্ন হয়নি বলেই দাবি তৃণমূলেরই।

রবিবার বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী তাঁর কঠোর সমালোচনা করেছেন সংবাদ মাধ্যমে। অধীর তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে ভাঙানোর অভিযোগও করেন এদিন। তিনি বলেন, ” তৃণমূল দলকে এই জেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেছিলেন এই পুলিশ আধিকারিক। জেলাপরিষদ ভাঙা থেকে আরম্ভ করে মুর্শিদাবাদ জেলায় কংগ্রেস দলকে ভাঙার সুপারি তিনি নিয়ে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে।”

মুকেশ যখন পুলিশ সুপার মুর্শিদাবাদের, সেই সময় তৃণমূলের পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময় কংগ্রেসের জেলা পরিষদ ভেঙে তৃণমূল দখল করে। সেই দলে ছিলেন মোশারফ হোসেন ওরফে মধু। যিনি গত দশ বছরে তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেস আবার কংগ্রেস ছেড়ে ফের তৃণমূলে ভিরেছেন। সূত্রের দাবি, যার নেপথ্যে ছিলেন এই মুকেশ কুমারই। অধীরের দাবিকে ভিত্তিহীন বলে এদিন মধুর দাবি, “সেদিনের নেতারা কংগ্রেসে কোনও মর্যাদাই পেতেন না। তাই সম্মান পেতে তৃণমূলকেই বেছে নিয়েছেন নেতা ও জনতা। কংগ্রেসের প্রতি মানুষের আগ্রহ সেদিনও ছিল না আজও নেই।”

আর মুকেশ কুমার যখন ডিআইজি হয়েছেন ততদিনে শুভেন্দু পদ্ম শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। অধীর এদিন বলেন, ” বিজেপি’র কাছাকাছি চলে আসায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্লু আইড বয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।”

সামনেই নির্বাচন, তাঁকে মুর্শিদাবাদে পাঠানো হলেও ফের নির্বাচন কমিশনের কু-নজরে পড়তে পারেন বলে সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছে না অবশ্য ওয়াকিবহাল মহল। অধীর সমালোচনা করে তাঁকে তৃণমূল পক্ষের পুলিশ বলে দাবি করলেও তৃণমূল নেতারা তা মনে করছেন না। মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান বলেন, “আমরা পুলিশ নিয়ে রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। জেলায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না হয় সেটাই আমাদের কাছে কাম্য। তবে ব্যক্তিগতভাবে এটুকু বলতে পারি মুর্শিদাবাদকে হাতের তালুর মতো চেনেন ওই পুলিশ আধিকারিক। এই সিদ্ধান্তে জেলার ভালোই হবে।” জেলা পরিষদের সদস্য অশেষ ঘোষ বলেন, ” এটা রুটিন বদলি। এর পেছনে রাজনীতি খোঁজা বিরোধীদের কু-অভ্যাস।”

আবু তাহের, অশেষরা সে কথা বললেও তৃণমূলের বিশেষ করে জেলা পরিষদের একটা অংশ মুকেশের আসার ব্যাপারে খুশি হলেও অন্য একটা অংশের দাবি, “দলটা এমন জায়গায় চলে গিয়েছে যে এখন আর কোনও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না।” অধীরও দাবি করেছেন, “জেলায় তৃণমূলের বেহাল হালকে ফিরিয়ে আনতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ফৌজ মোতায়েন করছে।” বিজেপির বহরমপুর সংগঠনের সভাপতি মলয় মহাজন বলেন, ” যখন ভোটারের ওপর, দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দল ভরসা হারায় তখন এইরকম ‘মনের মানুষ’ আধিকারিকদের ওপর ভরসা করতে হয় ভোট বৈতরণী পার করতে। কিন্তু জানে না সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights