‘দলবদল খারাপ কিছু নয়, আদর্শ এখন ঠুনকো’ দাবি নাড়ুগোপালের

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ আজ বাদে কাল রাজ্যে মন্ত্রীসভা গঠন হবে। বঙ্গে বিজেপি’র পথ চলাও শুরু হবে সেই ক্ষণ থেকে। আর এই প্রথম শাসককে পক্ষে নিয়ে পথ চলবে বহরমপুরও। তবে রাজ্যবাসী এই মূহুর্তে যদি শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়কের হত্যা নিয়ে বিচলিত থাকেন, বহরমপুর সে পথে যেন থেকেও নেই। এমনকি জেলায় বিজয়ী আট বিধায়কের কাউকে নয়া মন্ত্রীসভায় দেখা যাবে কি না তার থেকেও যে কৌতূহলে পুরবাসী একজোট মাচা থেকে চায়ের দোকান তা নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান নিয়ে। তা নিয়ে কোথাও উদ্বেগ, কোথাও কৌতূহলে ফের বিভক্ত বহরমপুর।
গেরুয়া ঝড়ে পালাবদল হয়েছে বাংলায়। এখনও জয়ের রেশ টাটকা। বিধানসভা ভেঙে দিয়ে রাজ্যে রাজ্যপালের শাসন শুরু হয়েছে আজ থেকেই। শনিবার রবীন্দ্রজন্মদিনে শপথ নেবে বিজেপি’র জয়ী বিধায়করা। ঘাসফুল জমানা শেষে বাংলায় পদ্ম শাসন শুরু হবে সেই দিন থেকেই। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলন করেন বৃহস্পতিবার। সরকার ছাড়া পুরসভা কীভাবে চালাবেন তাই নিয়ে নিজের দুঃশ্চিন্তার কথা তুলে ধরেন সংবাদমাধ্যমে।
চলতি বছর বিধানসভা নির্বাচনে নাড়ুগোপাল বহরমপুর বিধানসভা আসনে লড়াই করেছিলেন জোড়াফুল চিহ্নে। ফলাফলের নিরিখে দুই থেকে তিন নম্বরে নেমে এসে বহরমপুরে অধঃপতন হয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের। নিজের সাত নম্বর ওয়ার্ডেরও তিন নম্বরে নাড়ুগোপাল। ভোট প্রাপ্তির নিরিখে বিজেপি’র সুব্রত মৈত্র, কংগ্রেসের অধীর চৌধুরীর পরে তাঁর অবস্থান। নিজের ওয়ার্ডে তিনি ভোট পেয়েছেন ১৪৯৮টি।
কিন্তু বহরমপুর কথা রেখেছে নাড়ুগোপালের। ভোট প্রচারের অনেক আগে থেকেই বহরমপুর আসন জিততে মরিয়া ছিলেন নাড়ুগোপাল। তাঁর মধ্যে অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি নির্বাচকদের বোঝাতেন শাসকের সঙ্গে থাকলে শহরের ভাল। বহরমপুরবাসী তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। রাজ্যের ভাবি শাসকদল বিজেপি’র পক্ষেই থেকেছে বহরমপুর। সেই মতকেও এদিন সমর্থন করেছেন তিনি। একইসঙ্গে কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন পুরবাসীকে।
আর এই গেরুয়া হাওয়ায় বিভিন্ন মহলের দাবি নাড়ুগোপাল না কি পদ্মগামী। নাড়ুগোপালও সেই কৌতূহল জিইয়ে রেখে এদিন নিজের অবস্থান স্পষ্ট জানাননি। এটাও জানাননি তিনি তৃণমূলেই আছেন কি না? রাজ্যে তৃণমূল নেতাদের একাংশের দাবি মতো নাড়ুগোপালও মনে করেন ‘লাগাম ছাড়া দূর্নীতিই তৃণমূলের হারের অন্যতম কারণ।’ ফোনে বলেন, তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকেও অনেকসময় সেই অলিন্দ দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। অভিষেকের মত উচ্চ পর্যায়ের নেতার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাঁকে কিছু টাকা গুঁজে দিতে হয়েছে সেই নেতাদের পিওন, আর্দালির হাতে।
বহরমপুরের মতো মুর্শিদাবাদ জেলার আরও আটটি আসনে ফুটেছে পদ্ম। গ্রাম থেকে শহরে উড়ছে গেরুয়া আবির। বিজেপি’র এই জয়ে তৃণমূলেরও একাংশ পরিচিত মুখও খুশি। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই তা জানিয়ে দিচ্ছেন। কেউ বলছেন ইঙ্গিতে। একইসঙ্গে তাঁদের কথায় আছে দলবদলেরও ইশারাও। ইতিমধ্যেই ওই নেতারা রাজ্য বিজেপি’র বরিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যেমন দেখা করেছেন তেমন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের স্থানীয় কার্যালয়ে দূত পাঠিয়ে ভাবগতিক বুঝে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন বলে দাবি বিশ্বস্ত সূত্রের।
কংগ্রেসের কাউন্সিলর থেকে বিজেপি’র পরপর দু-বারের বিধায়ক সুব্রত ওরফে কাঞ্চন মৈত্র এতদিন ছিলেন বিরোধী আসনে। রাজ্য যখন ঘাসফুলে ছেয়ে গিয়েছে সেই সময় তিনি তৃণমূলে ফিরেছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই মোহভঙ্গ হলে কাঞ্চন নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে জনসংযোগে মন দেন। শুভেন্দু অনুগামী কাঞ্চন তাঁর পথ অনুসরণ করে ফেরেন পদ্ম শিবিরে। সেই সময় তাঁর গায়ে লেগে যায় ” হাওয়া মোরগ” তকমা। কিন্তু পরবর্তীতে পদ্মের কাঁটা খেয়েও তিনি শিবির বদলাননি। তার ফল পেলেন ২০২৬ এ।
নাড়ুগোপাল বলেন, ” আমি এখন বিজেপিতে যাব বলি তাহলে আমাকে নেবে? নেবে না। আমি হাংরিও নই। অনেকেই বলেছে। অনেক বিজেপি নেতা আমাকে ফোন করেছিলেন। বিজেপি দলটা তৃণমূলের মতো নয়।” সঙ্গে জুড়ে দেন ” আমার কাজ করার ক্ষমতা থাকলে আজ না হলেও দু-বছর পর প্রমাণিত হবে।” কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে ভিড়ে নাড়ুগোপাল চেয়ারম্যান হয়েছেন যে ভোটযুদ্ধে বিজেপি তাকে ‘লুটে নেওয়া ভোট’ বলে দাবি করে। কাঞ্চনের পথ অনুসরণ করে নাড়ুগোপাল বিজেপিতে যোগ দিলে তাঁকেও পেতে হবে হাওয়া মোরগ তকমা। যদিও নাড়ুগোপাল এদিন ওই সাংবাদিক সম্মেলনে দলবদল প্রসঙ্গে বলেছেন, ” দলবদল খারাপ কিছু নয়। আদর্শ এখন ঠুনকো।” তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি থেকে অবশ্য সরে গিয়েছে জোড়াফুলের যাবতীয় চিহ্ন।
স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই তৃণমূলের নেতাদের দলে নেওয়ার ব্যপারে অনিহা জানিয়ে রাজ্য সভাপতিকে চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে দল ত্যাগ করে নতুন দল তৈরি করে রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূলের ঘুম ছুটিয়ে যে বিধায়ককে সেলাম ঠুকছে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ, সেই হুমায়ুন কবীর এদিন বলেন, ” বিজেপি এদের নেবে না।”