মুর্শিদাবাদে স্ব-মহিমায় ফিরতে পারে কংগ্রেস, প্রশ্ন নেতৃত্ব নিয়ে

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ ঘাসফুল সরিয়ে রাজ্যে চালকের আসনে পদ্মফুল। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্ব মেনে আরএসএস-বিজেপি সাজাচ্ছে মন্ত্রীসভা। পালাবদলের হাওয়ায় তীব্র গরমও ম্লান জেলায় জেলায়। তারফাঁকে তৃণমূলের বিকল্প খুঁজতে ঘাম ঝরাচ্ছে মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু অধ্যূষিত জেলাগুলি।

বাংলার মসনদ থেকে তৃণমূল ক্ষমতাচ্যূত হওয়ায় দোটানায় ওই এলাকার একাংশ বিশেষ করে মুসলিম নেতারা। রাজনীতির স্রোতে টিকে থাকতে তাঁরা ভেলা খুঁজছেন বাংলায়। পর্যবেক্ষকদের একাংশের দাবি, বিজেপি বাংলায় দীর্ঘসময় ধরে শাসনের পরিকল্পনাতেই ঘুঁটি সাজাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে সেখানে ক্ষমতার সঙ্গে টিকে থাকতে পারবেন না ধরে নিয়েই মুসলিম নেতাদের কেউ কংগ্রেসের দরজায়, কেউ সিপিএমের দরজায় টোকা দিচ্ছেন। সূত্রের দাবি, মুর্শিদাবাদে সিপিএমের তুলনায় জাতীয় কংগ্রেসে ফেরার চাহিদা বেশি। কারণ ‘তাঁদের চোখ ফুটেছে কংগ্রেসেই’।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ডাক পেতে মরিয়া ছিলেন যে নেতারা, ভোটে তৃণমূলের হেরে যাওয়ার পর তাঁরাই সদর্পে এড়িয়ে গিয়েছেন তাঁকে। দল থেকে বহিষ্কারের মত সিদ্ধান্তেও তাঁরা আজ ডোন্ট কেয়ার। সম্প্রতি মমতার ডাকে সাড়া দেননি মুর্শিদাবাদ জেলাপরিষদের পদাধিকারী ছাড়াও সাধারণ সদস্যও বিশেষ করে মহিলারা। অথচ কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁদের কথা চলছে ইনিয়ে বিনিয়ে, দাবি সূত্রের। এমন সময় শনিবার কংগ্রেসের রাজ্য পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীর তৃণমূলের নেতাদের ঘরে ফেরার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “ যাঁদের জন্ম কংগ্রেসে, কংগ্রেসে যাঁদের চোখ ফুটেছে এবং যাঁরা এই দলের আদর্শে বড় হয়েছেন, অথচ কোনও বিশেষ পরিস্থিতি, চাপ, ক্ষোভ বা ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতার কারণে অন্য দলে গিয়েছেন, তাঁদের ফিরে আসার এটাই সুযোগ।”

কিন্তু সেই সুযোগের অন্তরায় এই রাজ্যে কংগ্রেসের নেতৃত্ব। প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া থাকা সত্ত্বেও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার তিন হাজার ভোটও নিজের পক্ষে টানতে পারেননি। হুগলির শ্রীরামপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি লড়ে পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৮৮৪টি। হেরেছেন অধীর চৌধুরীও। শুভঙ্কর যাঁর প্রবল বিরোধী। অধীর হারলেও কংগ্রেসের ভোট বাড়িয়েছেন ৩৩ শতাংশ। কিন্তু কংগ্রেস জিতেছে মুর্শিদাবাদেরই দুটি আসন। ফরাক্কা আর রানিনগর।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে নেতা্রা জিততে না পারলে জেতার দাবি করবেন কার কাছে? ঠিক একই প্রশ্নে কংগ্রেসের আর একটা গোষ্ঠী বিঁধছেন মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের জেলা সভাপতি রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ চক্রবর্তীকে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে যাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির ছিটে ফোঁটাও স্পর্শ করে না এমন কংগ্রেস অন্তঃপ্রাণ নেতাকে অধীরের পরামর্শে কংগ্রেস তাঁকে সাগরদিঘিতে টিকিট দেয় বলে কংগ্রেস সূত্রে জানা যায়। তিনি বাইরনের বিরুদ্ধে লড়াই করে পেয়েছেন ১০ হাজার ৩৪৮টি ভোট। কংগ্রেস নেমে এসেছে চারে। অথচ ২০২৩ এর উপনির্বাচনে কংগ্রেস বামেদের সঙ্গে জোট করে প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট বাড়িয়েছিল।

আর এই তথ্যের কচকচানিতে না গিয়ে রাজ্য এবং জেলায় নেতৃত্বের বদল এনে কংগ্রেসকে স্বমহিমায় ফেরাতে শপথ নিচ্ছেন তৃণমূলে আস্থা হারানো নেতারাও। ভোটে টিকিট না পেয়ে দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে নির্দল প্রার্থী হয়েছিলেন ফরাক্কার প্রাক্তন বিধায়ক মণিরুল ইসলাম।কিন্তু মমতার বকুনি খেয়ে তিনি প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করেন। তৃণমূল ভোটে হেরে যাওয়ায় তিনি ফের চড়া সুরে সমালোচনা করেছেন তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনিও কংগ্রেসের ফিরতে পারেন বলে সূত্রের দাবি। সেই দাবিকে সরাসরি মান্যতা না দিয়ে মণিরুল বলেন, ” আমাদের তো ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। তারপরে কোথায় কে গেল তা দলের আওতায় আর পরে না। কিন্তু যাঁরা দলের টিকিটে জিতে অন্য দলের খোঁজ খবর নিচ্ছেন তারা তো শৃঙ্খলাভঙ্গের আওতায় পড়বেন। দেখি দল তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়।” এরপরেই তিনি বলেন, ” যদি দেখি দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ কথা বলছেন না তখন ভাবব কোন পথে যাব? এখনও সময় আসেনি।”

এমনিতেই মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের ভেতরে ভাঙনের মোটা দাগ নজরে পড়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও। যাঁরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পেরে দলের সভাপতির বিরুদ্ধে সামনে ক্ষোভ জানিয়ে পরোক্ষে অধীর চৌধুরীর বিরোধীতা করছেন তাঁরাও দানা বাঁধতে পারছেন না কংগ্রেস কর্মী, সমর্থকদের কাছে। অথচ তাঁরাও জানেন মীর ভুল বলেননি। মনোজ বিরোধীতা চরমে উঠছে মুর্শিদাবাদে। অধীর চৌধুরী ঘনিষ্ঠরাও তাঁর বিরোধীতা করতে শুরু করেছেন, বলে দাবি সূত্রের। মনোজ অবশ্য এইসব আবোল তাবোল দাবিকে মান্যতা দিতে নারাজ। তাঁকে পাল্টা কটাক্ষ করে প্রথম সারির অধীর ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন, ” মোমবাতি আবার মশাল হয়ে জ্বলবে না তো?”

একইসঙ্গে শুভঙ্কর ও মীরের শনিবারের সাংবাদিক বৈঠককেও তেমন ‘ওজনদার’ বলতে নারাজ সেই বিক্ষুব্ধদের একাংশ। এক তৃণমূল নেতা বলেন, ” ওঁরা নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন। মানুষের মধ্যে প্রবল তৃণমূল বিরোধী হাওয়া ধরতেই পারেনি, এদিনও তাঁরা যে দাবি করছেন সেই দাবি নিয়েও ধন্দ আছে।” তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ” ভবিষ্যতে তৃণমূল আর কংগ্রেস ফের জোট বাঁধলে আমাদের দলত্যাগের তকমা কুড়িয়ে লাভ কী?” এই অবস্থায় নেতৃত্বের বদল না আনলে কংগ্রেস যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে যাবে বলে মনে করেন প্রবীণ ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights