
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ আঠার বছর আগে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসে প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রশাসনের কাজে গতি আনা থেকে রাজ্যে শিল্পের চাকা ঘোরাতে চেয়ে বলতেন ‘ডু ইট নাউ’।মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার মাস দুয়েক পরে মুর্শিদাবাদে প্রশাসনিক সভা করতে আজ শুক্রবার বহরমপুরে এসেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এদিন তাঁর মুখেও শোনা গেল প্রবাদ হওয়া সেই বুদ্ধ বাক্য। গত পনের বছর ধরে চলে আসা চেনা প্রশাসনিক বৈঠকেও যেন এবার ছেদ পড়ল।
রবীন্দ্রসদনে আগেও প্রশাসনিক বৈঠক হয়েছে। কিন্তু সেই বৈঠক সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেসবুক পেইজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হত। শুভেন্দু দুই জেলা পুলিশ সুপার, জেলাশাসক তথা দুই প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে এদিন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলেন। পরে বৈঠক থেকে বেড়িয়ে বৈঠকের একটা সারাংশ সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরলেন। বৈঠকে কাকে ধমকালেন, কাকে চমকালেন তাও থাকল আড়ালে। সম্মান বাঁচল আধিকারিকদের। বৈঠক থেকে বেড়িয়ে সেই কথাই প্রথম বললেন কেউ কেউ। একইভাবে কোনও আধিকারিককে বলতে না দিয়ে যা বলার মুখ্যমন্ত্রীই যে বলবেন তাও ঠিক করে দেওয়ায় অনেকেই বাম আমলের সঙ্গে এদিনের বৈঠকের তুলনা টেনেছেন।
এদিন রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জেলার বিভিন্ন চলমান সমাজকল্যাণমূলক এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী।গত সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দূর্নীতি ক্যান্সারের রূপ নিয়েছিল এদিন সে কথা স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “মুর্শিদাবাদের সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি হয়েছে।” তবে শুধু নেতা বা জনপ্রতিনিধি নয় অভিজ্ঞদের দাবি, সেই দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছে আমলাদেরও। তারও বিচার হবে বলে এদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। প্রশাসনের কর্তাদের ভুয়ো সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণের নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, “নতুন করে কেওয়াইসি (KYC) এবং আধার লিঙ্কেজ যাচাইকরণের ফলে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ধরা পড়েছে।”
প্রায় ৬০০টি ভুয়ো লক্ষ্মীর ভাণ্ডার অ্যাকাউন্টের খোঁজ মিলেছে জেলায়। খোঁজ পাওয়া গিয়েছে প্রায় ৩,৫০০টি ভুয়ো মাইনোরিটি স্কলারশিপ অ্যাকাউন্ট।এছাড়াও এসসি/এসটি (SC/ST) সার্টিফিকেট এবং প্রতিবন্ধী ভাতাতেও বহু ভুয়ো আবেদনকারী সুবিধা নিচ্ছিল বলে এদিন বৈঠক থেকে বেড়িয়ে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বিডিও-দের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। বলেছেন, “সমস্ত সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের তালিকা খতিয়ে দেখতে এবং ভুয়ো এন্ট্রিগুলির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বিডিও-দের (BDO) ২ মাসের কঠোর সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।”
- প্রায় ৬০০টি ভুয়ো লক্ষ্মীর ভাণ্ডার অ্যাকাউন্ট।
- প্রায় ৩,৫০০টি ভুয়ো মাইনোরিটি স্কলারশিপ অ্যাকাউন্ট।
- এসসি/এসটি (SC/ST) সার্টিফিকেট এবং প্রতিবন্ধী ভাতাতেও বহু ভুয়ো আবেদনকারী সুবিধা নিচ্ছিলেন।
খড়গ্রাম বিএমওএইচ (BMOH) অফিস থেকে ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র বিলি করার অভিযোগ উঠেছে। এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ” ওই চক্রের বিরুদ্ধে সিআইডি (CID) তদন্ত চলছে। ইতিমধ্যেই ৩৪টি কেস ধরা পড়েছে।” তিনি আরও বলেছেন, “এর সাথে জড়িত কোনো বিএমওএইচ বা বিডিও-র চাকরি তো যাবেই, সাথে জেলেও যেতে হবে।” মালদা ও মুর্শিদাবাদের ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ৩,৬০০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যামন্ত্রী। তারমধ্যে ৫০ শতাংশ দেবে কেন্দ্র এবং বাকি ৫০ শতাংশ দেবে রাজ্য। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা-ভগবানগোলা-লালগোলার ভাঙন দূর্গত এলাকার জন্য ২,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মিলিয়ে একটি প্রান্তিক পরিবার মাসে ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে বলেও এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেছেন শুভেন্দু।
পরিবারভিত্তিক আনুমানিক আয়:
বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মিলিয়ে একটি প্রান্তিক পরিবার মাসে ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
- পিএম কিষাণ সম্মান নিধি এবং কৃষক বন্ধু প্রকল্প।
- অন্নপূর্ণা যোজনা।
- বার্ধক্য ভাতা (যা ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে)।
- পিএম অন্ন সুরক্ষা যোজনা (বিনামূল্যে রেশন)।
- আয়ুষ্মান ভারত (৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা)।
- ১২৫ দিনের নিশ্চিত কর্মসংস্থান (অদক্ষ শ্রমিক: ৩০০ টাকা/দিন, অর্ধ-দক্ষ: ৪৫০ টাকা/দিন, দক্ষ শ্রমিক: ৬০০ টাকা/দিন)।
শুধু তাই অনুপ্রবেশকারী ঠেকানো যে তাঁর সরকারের অন্যতম লক্ষ্য এদিন বৈঠক শেষে সেই দাবিও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, “অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘জিরো-টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” এ পর্যন্ত মাত্র ৬৯ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে । তবে এই কাজে গতি আনতে বিএসএফ (BSF)-এর সাথে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় মাদক পাচারের বিরুদ্ধে পুলিশকে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তৎপরতায় বিএসএফ-এর জন্য প্রয়োজনীয় ৩৬৮ একর জমির মধ্যে ৩৪৮ একর জমি ইতিমধ্যেই সফলভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নারী নিরাপত্তায় জোর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, সীমান্ত এলাকায় নারী ও শিশু পাচার এবং নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ কঠোরভাবে দমন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আদালতের যে সাজাগুলি উচ্চ আদালতে আটকে আছে, সেগুলি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এজি (AG) এবং অ্যাডিশনাল এজি-র সাথে কথা বলতে জেলাশাসককে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। তবে এদিন মুখ্যমন্ত্রী সড়ক পথে আসায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে প্রশাসনিক বৈঠক, সাংগঠনিক বৈঠক শুরু হয়েছে। এমনকি রেজিনগরের জনসভাও শেষ হয়েছে সন্ধ্যা সাতটায়। আর এই লম্বা সময় একাধিক রাস্তা নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকায় ঘুরপথে যাওয়ায় বহরমপুরে বিকেল পর্যন্ত ভোগান্তি হয়েছে মানুষজনের।