পরিবর্তনের পরিবর্তন লক্ষ্যে রেজিনগরে সভা মুখ্যমন্ত্রীর

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জেলায় আসছেন শুক্রবার। ওইদিনই বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে তাঁর প্রশাসনিক বৈঠক রয়েছে। তারপরে তিনি চলে যাবেন রেজিনগরে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিতে। রাজ্যে পালাবদলের পরে এই প্রথম মুর্শিদাবাদে নয়া মুখ্যমন্ত্রীর সফর ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ততা বেড়েছে জেলা সাধারণ ও পুলিশ প্রশাসনের। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রবীন্দ্রসদন ঘুরে যান জেলাশাসক, জেলা পুলিশ সুপার সহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। কাল বুধবার রবীন্দ্রসদনে বৈঠকে বসবেন দুই প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। একইভাবে রেজিনগরে সভাস্থল পরিদর্শন করে আসেন বিজেপি’র বহরমপুর সংগঠনের সভাপতি মলয় মহাজন। সভাস্থল ইতিমধ্যেই সরেজমিনে পরখ করে এসেছেন জেলাশাসকও।

শুক্রবার রবীন্দ্রসদনে সভা। সেই সভাস্থল নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলার নির্দেশ রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের কাছে।জনসভা ও প্রশাসনিক সভা একইদিনে দুটি পৃথক জায়গায় হওয়ায় নিরাপত্তা কড়াকড়ি করতে ভিন জেলা থেকেও আসছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বাড়ানো হয়েছে পুলিশের নাকা চেকিং পোস্ট। ওই দিন প্রশাসনিক বৈঠক শেষে বিকেল চারটের সময় রেজিনগরের তকিপুর হাই মাদ্রাসার মাঠে তাঁর জনসভা করার কথা।

নওদার পাশাপাশি এই বিধানসভা থেকে এবার নির্বাচনে বিপুল জনাদেশ পেয়ে বিধায়ক হয়েছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। তিনি ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৫৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে মূলত লড়াই ছিল বিজেপি’র বাপন ঘোষের। তিনি হুমায়ুনের প্রায় অর্ধেক ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু দুটি বিধায়কের বদলে হুমায়ুন নওদার আসন নিজের জিম্মায় রেখে রেজিনগর আসন থেকে পদত্যাগ করেছেন, তাই উপনির্বাচন হবে রেজিনগরে। বিজেপি’র দাবি উপনির্বাচনে এই হিসেব উল্টে যাবে। বিজিপি’র বহরমপুর সংগঠনের সভাপতি মলয় মহাজন দাবি করেন, ” এ এক অদ্ভুত নির্বাচন হচ্ছে। যখন বিজেপি হারলেও কমবে না আর এজেউপি জিতলেও বাড়বে না।”

তিনি বোঝাতে চান, যদি বিজেপি উপনির্বাচনে হেরে যায় এই বিধানসভায়, তাহলেও রাজ্য সরকার গঠনে কোনও বাধা তৈরি হবে না। আর এজেইউপি জিতলেও ওই দলের বিধায়ক সংখ্যা দুই ছিল দুই-ই থাকবে। এরসঙ্গে তিনি বলেন, ” এজেইউপি জিতলে বাবা ও ছেলে বিধায়ক হবেন। ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত লাভ হবে। এলাকার মানুষ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে যাবেন। তাই মানুষ চাইছেন বিজেপি’র সঙ্গে থাকতে। তাই এবার উপনির্বাচনে মানুষ অন্য কাউকে নয়, ভরসা পেতে বিজেপিকেই ওই আসনে জয়ী করবেন।”

মুর্শিদাবাদের ২২টি বিধানসভার মধ্যে অন্যতম এই রেজিনগর বিধানসভা। আর রেজিনগররের সমার্থক হুমায়ুন কবীর। তাঁর বিরোধী মানেই রবিউল আলম চৌধুরী। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পরেও এই বিধানসভায় জয়ী হয়েছিল কংগ্রেস। সেবার এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন হুমায়ুন। কিন্তু তিনি ২০১৩ সালে বিধায়ক পদে ইস্তফা দিয়ে তৃণমূল দলে নাম লেখান। স্বাভাবিকভাবেই ওই বছর রেজিনগরে হয় উপনির্বাচন। কিন্তু হেরে যান হুমায়ুন। জয়ী হন কংগ্রেস প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। কংগ্রেসের টিকিটি জিতলেও তিনি পরে হাত ছেড়ে ঘাসফুলে নাম লেখান ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে লড়াই করেন তৃণমূলের প্রতীকে। তাঁর জয়ের ধারা অব্যহত ছিল ২০২১ সাল পর্যন্ত।

১৩ বছর তিনি যখন ওই এলাকার বিধায়ক সেই সময় রেজিনগরে হুমায়ুনের ছায়া হাল্কা হয়েছে। হুমায়ুন দূরে গেলেও তিনি আবর্তিত হয়েছেন সেই রেজিনগরকে ঘিরেই। পরিবর্তনের বাংলায় হুমায়ুনকে রেজিনগরের মানুষ ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁকে জননেতায় পরিণত করেছেন। তাঁর দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টিকে স্বীকৃতি দিয়ে হুমায়ুনকে ফুটিয়ে তুলেছেন রেজিনগরবাসী। সেই জয় হুমায়ুনকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। ছেলে গোলাম নবী আজাদ ওরফে রবীনকে প্রার্থী করেছেন। গত দু-মাসে তৃণমূল দল শত টুকরো হয়েছে। তবু কব্জি ঘুরিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন রবিউল আলম চৌধুরী। তিনি এখনও মমতাপন্থীই। কিন্তু বিজেপির হিসেব আলাদা।

মলয় বলছেন, হুমায়ুন ধর্মীয় তাস খেলে মুসলিম মসিহা হয়েছেন। সেই মুসলিমদের মোহভঙ্গ হয়েছে নির্বাচনের পর। তাঁর দল সরকার নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে দাবি করেছিলেন হুমায়ুন। সেই অবস্থাও তৈরি হয়নি। বিজেপি একাই দু’শো পার করে দেখিয়ে দিয়েছে। তিনি উপয়ান্তর না দেখে ফের ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে উপনির্বাচনের বৈতরণী পার করতে চাইছেন। মলয় বলছেন ” এবার সেটা হবে না।” তাঁর কথায় গত ১৫ বছরে রেজিনগর কিছুই পায়নি। তার আগে শিল্পতালুকের গাজর ঝুলিয়ে কংগ্রেসকে ভোট পাইয়ে দায় সেরেছে বামফ্রন্ট। এখানে একটাও কলেজ নেই মেয়েদের। হাসপাতাল নেই। কাটমানি আর তোলাবাজির পয়সা দিতে দিতে মানুষ নিজের অধিকারটাই ভুলে গিয়েছেন। আর ধর্মের আগুনে নিজেদের সেঁকেছেন হুমায়ুনের ইন্ধনেই। আজ পর্যন্ত কাজের মানুষ পাননি রেজিনগরবাসী। এবার পাল্টাবে।

একসময় তৃণমূল সরকারের সেকেন্ড ইন কমান্ড শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বেই মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের গড় ভেঙে তৈরি হয়েছিল তৃণমূল শিবির। তৃণমূলের প্রতীকে জিতে মুর্শিদাবাদের প্রায় সকল জনপ্রতিনিধিই ঋতব্রত শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। সেই শিবিরের সঙ্গে শুভেন্দুর সম্পর্কের কথা এখন ওপেন সিক্রেট। রেজিনগরে ঋতব্রত শিবির আলাদা করে কাউকে প্রার্থী দেবে না কি এই উপনির্বাচনে দূরত্বে থেকে বিজেপিকে সমর্থন করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। রাজ্যের রাজনীতির এইরকম অস্থির অবস্থায় দুটি কেন্দ্রে উপনির্বাচনে বিজেপি-র পাল্লাই ভারি বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সদ্য শেষ হওয়া বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষকে প্রার্থী করলেও উপনির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করা হবে না বলেই দলীয় সূত্রে জানা যায়। তাঁর জায়গায় কাকে প্রার্থী করলে দলের লাভ হবে সেই নাম এখনও আস্তিনেই লুকিয়ে রেখে মলয়কেই এলাকাবাসীর মন যাচাইয়ের ভার দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর জনসভায় কী বার্তা দেন সেদিকেই তাকিয়ে রেজিনগরবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights