
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ বিতর্কিত শিক্ষক বদলির আবহে মুর্শিদাবাদ জেলা বিদ্যালয় (প্রাথমিক)পরিদর্শক অপর্ণা মন্ডলকে বদলির নির্দেশ পাঠাল বিকাশ ভবন। তাঁকে কালিম্পংয়ে পাঠিয়ে সেখান থেকে সমর চন্দ্র মন্ডলকে ওই পদে আনা হচ্ছে বলে সোমবারের সেই নির্দেশে জানা যায়। নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রথমে জেলার ২২টি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির নির্দেশ দিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অপর্ণা।পরে বিতর্কের মুখে পরে তা বাতিল করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। সেই নির্দেশ ও পাল্টা নির্দেশ পরিবর্তনের জমানাতে প্রশ্ন তুলেছিল। যদিও জেলা শিক্ষা ভবনের একাংশ আধিকারিক এই বদলিকে রুটিন বদলি হিসেবেই দেখছেন। আরএসএস পন্থী শিক্ষক সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈখিক মহাসংঘের সভাপতি অনুপম মৈত্রও বলেন “এটা রুটিন বদলি।” এবিপিটিএ-র মুর্শিদাবাদ জেলা সম্পাদক মাহামাদুল হাসান অবশ্য একে রুটিন বদলি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, “অনেকগুলো অসংগতি ছিল সেদিনের নির্দেশে। এবং ওখানে আমরা জানতে পারলাম যে শাসক দলের কিছু নেতার চাপে পড়েই ওঁকে ওই কাজ করতে হয়েছিল। সেটা উনি পরিষ্কারভাবে অনেকের সামনেই জানিয়েছেন। তাই মনে হয় না বিতর্কিত শিক্ষক বদলির আবহে ডিআই এর বদলির রুটিন বদলি। উল্টে বিতর্ক চাপা দিতেই গেরুয়া সরকার তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
কি নিয়ে বিতর্ক?
ঘটনার সূত্রপাত, গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার। ওইদিন মুর্শিদাবাদ জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ থেকে একটি নির্দেশিকায় রাতারাতি বদলে যায় বাইশজন প্রধান শিক্ষকের কর্মস্থল। নিয়মবহির্ভূত সেই নির্দেশ নিয়ে সরব হয়েছিলেন একাধিক শিক্ষক সংগঠনের নেতারা। ‘চাপে পড়ে’ সেই নির্দেশ পরে অবশ্য ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন মুর্শিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তথা জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক) অপর্ণা মন্ডল। সেই বিতর্কের মাঝে সোমবার রাতে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ থেকে স্কুলের শূন্যপদের তালিকা বেরোয়। ২৩২ জন অতিরিক্ত শিক্ষকের পাশে রয়েছে ২৩২ টি শূন্যপদ। যা ফের উস্কে দিয়েছিল বিতর্ক।
কিন্তু কেন ঘটল এই ঘটনা ?
বিভিন্ন সূত্রের খবর মুর্শিদাবাদ মহকুমার একটি প্রাথমিক স্কুলে সরকারি নির্দেশ থাকা সত্বেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন পালন হয়নি। সেই খবর জেলা প্রশাসনের কানে পৌঁছতেই ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে বদলির নির্দেশ পাঠানো হয়। “আর সেটাই হয় সুযোগ।” অভিযোগ, রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতি প্রত্যুষ মন্ডল সেই সুযোগ নিয়ে মুর্শিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তথা জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক) অপর্ণা মন্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৃহস্পতিবার ২৭ জুলাই ওই নির্দেশ পাঠাতে বাধ্য করেন। নিয়ম বহির্ভূত সেই কাজে প্রথমে আপত্তি থাকলেও পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় পরিবর্তনের জমানার কথা ভেবে ‘রিস্ক’ নেননি ওই আধিকারিক, দাবি সূত্রের । কিন্তু সেই নির্দেশ ভাইরাল হতেই ফের তা ফেরাতে হয় জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক)কে। মুখ পোড়ে মন্ত্রী গৌরীশঙ্করের। দলের অন্দরে চরম সমালোচনার জেরে একপ্রকার চাপে পড়ে বিজেপি মুর্শিদাবাদ সংগঠনের সহ-সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন প্রত্যূষ। শিক্ষকদের একাংশের দাবি, “ উনি মুর্শিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের অঘোষিত চেয়ারম্যান বলেও দাবি করেছেন নিজেকে।”
এখানেই শেষ নয়, বহরমপুরের গির্জাপাড়া বীনাপাণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুদীপ্ত সিনহা বিজেপি’র বহরমপুর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। তিনি একধাপ আরও এগিয়ে স্রেফ শাসকদলের তকমা লাগিয়ে একটি স্কুলকে ভ্যানিস করে দিলেন বিদ্যালয় ভবন সংস্কারের ছুতোয়। তা নিয়ে আরএসএস পন্থী শিক্ষক সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈখিক মহাসংঘের কর্মীরা হইচই ফেলে দেওয়ায় সেই সিদ্ধান্তও ফেরাতে বাধ্য হন জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক)। এই প্রধান শিক্ষক তথা বিজেপি কার্যকর্তা এর আগে কান্দি থেকে এসে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুলে ড্রাফটিং টিচার হিসেবে প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। তখন একটি মামলায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক দুলাল ঘোষ বিচারাধীন ছিলেন। আদালতে সেই মামলার নিষ্পত্তি হলে দুলাল ফিরে আসেন স্বপদে। কিন্তু সেদিন তাঁকে বাধা দিয়েছিলেন তৎকালীন তৃণমূল ঘনিষ্ঠ সুদীপ্ত। অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক দুলালকে ঠেকাতে তিনি অভিভাবকদের একটি অংশকে তাঁর পক্ষ নিতে বাধ্য করেছিলেন। সেই মতো স্কুলের মূল দরজা আটকে বিক্ষোভও দেখিয়েছিলেন সেইসব অভিভাবকরা। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। তারপরেই বিজেপির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও পরে পদপ্রাপ্তি। তিনি সংগঠনে মলয় মহাজন ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বেআইনি কাজ করায় প্রত্যূষ পদত্যাগ করলেও এখনও স্বপদে বহাল সুদীপ্ত। তাঁকে ফোন করলেও মেলেনি উত্তর। ফোন ধরেননি মলয়ও।
এই দুই ঘটনা বিজেপি’র অন্দরে অসন্তোষের ঝড় তুলেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেআইনিভাবে শিক্ষক বদলিতে হস্তক্ষেপ করেছেন বিজেপি সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত নেতারা আর তা শীর্ষস্তরের অনুমতি ছাড়াই। অনুপম অবশ্য বলেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য হয়ে রাজনৈতিক সংগঠনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।” মাহামাদুল হাসান বলেন, “ উনি যে সংগঠনই করুন না কেন, তা শিক্ষা স্বার্থবিরোধী হলে সেটা অবশ্যই সমাজের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। তা স্বাভাবিকভাবেই উনি যেটা করেছেন, যেটা আমরা শুনেছি বা বা বিষয়গুলো অনুধাবন করেছি, তাতে সেটা অবশ্যই ঠিক হয়নি এবং এটা একটা সংস্কৃতি হয়ে গেছে। গত ১৫ বছর ধরে যে সংস্কৃতি চলেছে, তার এটা কোনো অন্যথা নয়। এটা বরং সেটাকে আরও গিয়ার-আপ (gear up) করা হচ্ছে।”