
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ নিট প্রশ্ন ফাঁস মামলায় গত দেড় মাসের বেশি সময় ধরে উত্তপ্ত হয়েছে দেশ। দিল্লির যন্তরমন্তরের সেই ক্ষোভের আগুন ছুঁয়েছিল রাজ্যের মাটি। প্রতিবাদে শামিল হয়েছিল বহরমপুরও। সোনম ওয়াংচু সহ ছাত্র ও নাগরিকদের আমরণ অনশনে সংহতি জানিয়ে এক নাগরিক সভার ডাক দিয়েছিল “আমরা যারা রাজপথ ছাড়িনি”-র সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গ দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের কর্মী সহ বিভিন্ন বাম সংগঠন। চলতি মাসের ১৮ জুলাই বহরমপুর টেক্সটাইল কলেজ মোড়ের সেই সভা দেশের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে ও নাগরিকদের সই সংগ্রহ করে। অভিযোগ, বেআইনি জমায়েত দাবি তুলে আইসি সন্দীপ সেনের নেতৃত্বে বহরমপুর থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানরা কর্মসূচিতে বাধা দেয় ও বলপ্রয়োগ করে বেআইনিভাবে চারজন প্রতিবাদীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন বীক্ষণ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মিলন মালাকার, তাঁর মেয়ে দিশারী মালাকার, বিকাশ দাস ও মুসা করিম। নাট্যকর্মী দিশারি ও বিকাশ পেশায় স্কুল শিক্ষক। আন্দোলনকারীদের পুলিশ গাড়িতে তোলার সময় গায়ে হাত তোলে বলে অভিযোগ। এমনকি থানার লকআপে দিশারীকে চড় থাপ্পড় মারার অভিযোগ ওঠে। যা মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে দাবি আইনজ্ঞদের। ডি. কে. বসু মামলা অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে কোনো নাগরিককে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না বলে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশও রয়েছে। পুলিশ অবশ্য তা মানতে নারাজ। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও গায়ে হাত তোলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার পাল্টা অভিযোগ রয়েছে পুলিশের। যদিও পুলিশ ওইদিন রাতে ব্যক্তিগত বন্ডে ধৃতদের ছেড়ে দেয়।

দিল্লি সহ সব রাজ্যে নিট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে ও প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছিল নাগরিক সমাজ। সেই বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে একাধিক জায়গায়। এমনকি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অতি সক্রিয়তারও অভিযোগ ওঠে। একাধিক মামলা হয় বিভিন্ন রাজ্যের থানায় থানায়। পরে দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশে পুলিশ মামলা প্রত্যাহার করে ও গ্রেফতার হওয়া নাবালকদের মুক্তি দেয়। সেই সঙ্গে শীর্ষ আদালত সরকারকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, ধৃতদের বিরুদ্ধে যদি অতীতে অপরাধের অভিযোগ না থাকে তাহলে তাঁদেরকেও মুক্তি দিতে হবে। বহরমপুরের ঘটনাতেও পুলিশ ধৃতদের বিরুদ্ধে কর্তব্যরত সরকারি কর্মীর গায়ে হাত তোলা ( বিএনএস ১২১(১)), বেআইনি জমায়েত ( বিএনএস ১৮৯), সরকারি কাজে বাধা দেওয়া (বিএনএস২২১)র অভিযোগে স্বতঃপ্রণোদিত (Suo Motu) মামলা করে। এদের মধ্যে দুটো জামিন যোগ্য, প্রথমটি জামিন অযোগ্য ধারা। দাবি, সেই মামলা এখনও প্রত্যাহার করেনি মুর্শিদাবাদ পুলিশ।
তারই প্রতিবাদে আজ শুক্রবার বিকেলে বহরমপুর টেক্সটাইল কলেজ সংলগ্ন চৌতারায় সাংবাদিক বৈঠক ডাকা হয় ‘আমরা যাঁরা রাজপথ ছাড়িনি’র পক্ষ থেকে। সেখানে উপস্থিত সদস্যরা সেদিনের কর্তব্যরত পুলিশদের ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে সরব হন ও দোষীদের শাস্তির দাবি তোলেন। সেই দাবিতে পুলিশ সুপারকে তাঁরা স্মারকলিপি ও জমা দেবেন বলে জানান। দিশারির মা রীতা বলেন, ” থানায় নিয়ে গিয়ে লকআপে পুরে দেয় আর সেখানে কিল ঘুঁষি মারে। গায়ের জোরে মহিলা পুলিশ হাত মুচড়িয়ে দেয়। সারা গায়ে কালশিটে পরে যায়।” এই ঘটনা মুর্শিদাবাদ পুলিশ সুপারকে চিঠি লিখে জানান তিনি। পুলিশ সুপার তাঁর সঙ্গে দেখা করেন বলে ওই সাংবাদিক সম্মেলনেই দিশারীর মা দাবি করেন। পুলিশ সুপারের কাছে দোষী পুলিশের শাস্তির দাবি করেছেন রীতা দেবীও। বিষয়টি পুলিশ সুপার সচিন মাক্কার খতিয়ে দেখছেন বলে তাঁকে আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকও পুলিশ হেফাজতে দিশারীকে মারধরের কথা উল্লেখ করেছেন প্রেসক্রিপশনে।

সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য সন্দীপন দাস বলেন, ” পুলিশ সেদিন জোর করে প্রতিবাদী ভাবনাকে আটকে ঘৃণ্যতর কাজ করেছে। যদিও আমাদের অনুরোধে সেদিন ব্যক্তিগত বেলবন্ডে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু পুলিশকে বলবো শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মেনে কেন্দ্র ও রাজ্যের মতো এক্ষেত্রেও মামলা প্রত্যাহার করুক।” কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী কিরণ শেখ বলেন, ” পুলিশ আইন ও সংবিধান অনুযায়ী অনেক কিছু করতে পারে, কিন্তু যা ইচ্ছে তা করতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, ” ঘটনাটার রেসপেক্টে যদি এফআইআর এবং তার রেসপেক্টে ক্রিমিনাল কেস ইনিশিয়েট করে থাকে, এবং সেটা কেন্দ্রীয় সরকারের যে সিদ্ধান্ত, সে সিদ্ধান্তের একেবারে পরিপন্থী। এবং রাজ্য সরকার সে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিয়ে তারাও মামলা তুললো। যদিও ল অ্যান্ড অর্ডার রাজ্যের বিষয়, তা থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত যে তারা মামলা প্রসিড করবে না বা মামলা যেগুলো হয়েছে সেগুলোকে উইথড্র করবে, যদি তারা না করে তাহলে সে আন্দোলন… তার ফলে যে নেগোশিয়েশন সেটার ভায়োলেশন শুধু হলো না, সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিষয়টাকে একটা মিস ডাইরেক্ট এবং ডাইভার্ট করা হলো।”
আন্দোলন করা সাংবিধানিক অধিকার, অ্যাসেম্বলি বা অ্যাসোসিয়েশন, সেগুলো আর্টিকেল ১৯-এর পার্ট এবং মৌলিক অধিকার তার, সেই মৌলিক অধিকারটা এক্সারসাইজ করা। পুলিশের দায়িত্ব মৌলিক অধিকারগুলো তারা ঠিকভাবে পরিকল্পনা অনুসারে পরিচালনা করতে পারছে কি না তা এনসিওর করা। আর মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে যদি রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে মামলা করে, তাহলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক শুধু না, এটা নীতি-নৈতিকতা এবং সঙ্গে সঙ্গে আইনবিরোধী ও সংবিধানবিরোধী কাজ বলে দাবি করেন ওই আইনজীবী।