আর্জেন্টিনার মতো নড়বড়ে খেলা দেখানোর আয়োজন, ম্যাচ জিতলেও আয়োজকরা স্পেন নয় দাবি বহরমপুরের দর্শকদের

Social Share
জেলাশাসক আর অর্জুন সহ জেলা প্রশাসনের অন্য আধিকারিকরা

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের কাছে এক গোলে হেরে গিয়েছে লিওনেল মেসির দল। অথচ এমন হওয়ার কথা ভাবনাতেই আনেননি ফুটবলপ্রেমি নয়া প্রজন্ম। তাঁদের কাছে মেসি হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের ঈশ্বর। শুধু কি তরুণ প্রজন্ম। মেসি প্রেম কোন পর্যায়ে গেলে বিপর্যয় পর্যন্ত ঘটতে পারে, ডিসেম্বরের আনলাকি থার্টিনে তা দেখেছিল কলকাতা। সেই ঈশ্বরের ঐশ্বরিক প্রতিভা ফুটবল প্রিয় বাংলার মানুষজন স্টেডিয়ামে বসে চাক্ষুষ করতে না পারলেও সাধ্যমতো কেউ মোবাইলে, কেউ টিভিতে উপভোগ করতে রাত জেগেছিলেন রবিবার। সেই আনন্দকে বাঁধন ছাড়া করতে ঘন জনবসতি এলাকা প্রতি এক লক্ষ টাকা খরচ করে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার ব্যবস্থা করেছিল বাংলায় পরিবর্তনের সরকারের যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া দফতর।

খেলা দেখায় মগ্ন বহরমপুরের দর্শক

বহরমপুর পুরসভা ও জেলা প্রশাসন সেই ব্যবস্থা করেছিল স্কোয়ার ফিল্ডে, জেলা শাসকের বাংলোর উল্টোদিকে। বড় স্ক্রিন, ওজনদার মিউজিক সিস্টেম, আর এক থেকে দেড়শো জনের বসার মতো চেয়ারের আয়োজন ছিল বলে দাবি করেছেন মাঠে উপস্থিত দর্শকরা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক আর অর্জুন স্বয়ং। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বহরমপুরের মহকুমাশাসক সমীরণ বারিক, ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক অমরজ্যোতি সরকার, পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিক অভিজিৎ চৌধুরী। যদিও অভিজিৎ বাবুর দাবি, ” ভিআইপি চেয়ার নিয়ে ২৭০ জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”

রাত সাড়ে বারোটায় খেলা শুরু। তার প্রায় ঘন্টা দেড়েক আগে থেকেই ফুটবল প্রিয় মানুষজন মাঠে আসতে শুরু করেন। একসময় সবকটি চেয়ার দখলে চলে যায় তাঁদের। তারপরেও রাত একটা পর্যন্ত মানুষ আসতে থাকেন স্কোয়ারে, বাড়তে থাকে ভিড়। ততক্ষণে খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশ্বকাপের ফুটবল লাল-হলুদ আর নীল সাদা দলের মধ্যে পাক খেতে থাকায় গোল পর্যন্ত পৌঁছচ্ছিল না। ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটছিল দর্শকদের। যিনি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন সদ্য তিনি খেলা দেখাতো দূর স্ক্রিনের নাগালই পাচ্ছিলেন না। সামনে তখন এলোমেলো কালো কালো মাথা। যাদের অধিকাংশ বিশ-পঁচিশের যুবক। তাঁরাই খেলা দেখায় উত্তেজনা বাড়াতে মেসির পায়ে বল আসতেই চিৎকারে নিশিরাত জাগিয়ে তুলছিলেন বারংবার। আর সেই উত্তেজনায় অংশ নিতে না পেরে একাধিকবার চেয়ার সরিয়ে দেওয়ার আওয়াজ তুলছিলেন মাঠে আসা দর্শকরা।

এইভাবে সরিয়ে ফেলা হয় বসার চেয়ার

আয়োজকরা প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও একসময় সেই দাবি মেনে নিয়ে চেয়ার সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন তাঁরা। পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিক এদিন তা স্বীকারও করে নেন। বলেন, ” এত ভিড় হবে বুঝতেই পারিনি।” ভিড় সামলিয়ে সুস্থভাবে এই কর্মসূচি উতরোতে মহকুমা শাসককে বলতে শোনা যায়, ” দয়া করে বসে পড়ুন। সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে বসে বসে খেলা দেখুন। পিছনে যাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা খেলা দেখতে পারছেন না।” সেই অনুরোধ না রাখলে তিনি খেলা বন্ধ রাখারও হুমকি দেন। ততক্ষণে ডেকরেটরের চেয়ার হাতে হাতে চলে গিয়েছে ঘেরাটোপের বাইরে।

বড় স্ক্রিন ছেড়ে মোবাইলে ভরসা

তারমধ্যে ঠাস বুনোনে গাঁথা স্পেন একাদশের কারও পায়ে লেগে দু-একবার যাওবা বল গোলের দিকে গড়াল, তাও বারপোস্টে ধাক্কা লেগে চলে গেল মাঠের বাইরে। আর ততই মেসি প্রেমিদের উচ্ছাস গেল বেড়ে, সঙ্গে গলা ফাটানো চিৎকার। যা রাত দুপুরের নিস্তব্দতাকে ভেঙে খান খান করে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত জয়ের তিলক না কাটতে পারায় হতাশ হলেন মেসি ভক্তরা। আর ম্যাচ শেষে বাহবার বদলে আয়জনের অব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। অনভিজ্ঞতার তকমা লাগল আয়োজকদের গায়ে। দর্শকদের কেউ কেউ বলেই ফেললেন ” যেমন নড়বড়ে আমাদের প্রশাসন। তেমনি নড়বড়ে আর্জেন্টিনা। একবারও আক্রমণে গেল না ওদের কেউ। মেসিরা ভাবছিল আজও শেষ পনেরো মিনিটে কাঁপিয়ে দেবে বিশ্ব। এ যেন ছেলের হাতের মোয়া। হুঁ!” মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে না পেয়ে হতাশ ফুটবল প্রেমিদের রাগ গিয়ে পড়ল আয়োজকের ওপর।

ভিড়ের মধ্যেও চোখ ভরসার মোবাইলে

সেই সুরে সুর মিলিয়ে কলেজ পড়ুয়া অনির্বাণ মন্ডল, সুজয় দেব, সাবনুররা বললেন, ” একটুকরো প্যান্ডল করে একশো জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর নেমতন্ন করা হয়েছে গোটা শহর ছাড়িয়ে গ্রামের হাজার খানেক মানুষজনকে।” তাঁদের যুক্তি, “দরকার ছিল আরও অন্তত তিনটি বড় স্ক্রিনের। তাহলে এইরকম গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হতো না। মানুষ খেলা দেখতে এসেছিল যুদ্ধ করতে তো নয়।” বড় স্ক্রিনে খেলা দেখতে এসে মোবাইলে খেলা দেখা শেষ করে বাড়ির পথ ধরেন চিরঞ্জীব ও তাঁর বন্ধুরা। যেতে যেতে বলেন, “এর থেকে বাড়িতে বসে খেলা দেখলে ভাল হত। স্পেন জিতেছে খেলার দক্ষতায়। প্রশাসনও ম্যাচ জিতলো ঠিকই কিন্তু স্পেনীয় দক্ষতায় নয়,আইনের বদন্যতায়।” অভিজিৎ বাবু বললেন, ” সবাই খেলতে নেমেই খেলার নিয়ম শেখে। এক ভুলের পুনরাবৃত্তি পরের খেলায় হয় না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights