
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ দলের ঘোষিত নীতি মেনে গত বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী বিধায়ক সুব্রত মৈত্রকেই প্রার্থী করেছে বিজেপি। ২০২১ সালে গোটা বাংলাকে চমকে দিয়ে কংগ্রেসের হাত থেকে ছিনিয়ে বহরমপুরে পদ্ম ফুটিয়েছিলেন সমাজসেবী কাঞ্চন। বহরমপুর পেয়েছিল নতুন বিধায়ক। এবার দ্বিতীয়বারের জন্য তাঁকেই প্রার্থী করেছে বিজেপি। যদিও সূত্রের দাবি, বহরমপুরে বিজেপির একটা অংশ শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রার্থী পদের বিরোধীতা করেছিল।
কিন্তু সে সব কিছুকে সরিয়ে কাঞ্চন ফের লড়াইয়ের ময়দানে। প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা হওয়ার পরেই কাঞ্চন শিবির উল্লসিত। বিধায়ক হওয়া ইস্তক বারবার বিরোধীরা তো বটেই, তাঁর দলেরও একটা অংশ তাঁর নামের সঙ্গে “হাওয়া মোরগ” তকমা জুড়ে দিতে পিছপা হননি। কাঞ্চন তাঁদের সাইড লাইনে দাঁড় করিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের আজ সন্ধ্যেয় ধন্যবাদ দিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমের সামনে। তখন রোজা শেষে ইফতারে ডুবে গোরাবাজারের একটা বড় অংশ। যাদের আবার একটা বড় অংশ বিজেপি’র থেকেও কাঞ্চন ভক্ত বলে পরিচিত বহরমপুরে। কাঞ্চন জানেন সেই ভোট তাঁর পক্ষেই যাবে, দাবি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের।
কাঞ্চন বলছেন, ” গত পাঁচ বছরে এলাকার বিধায়ক হিসেবে কে হিন্দু, কে মুসলমান তা আমার চিন্তায় আসেনি। যে যখন যেভাবে আমার কাছে এসেছেন আমি তাঁকে সেইভাবেই সাহায্য করেছি। কিন্তু সেটা ভোটের হিসাব নিকাশ করে নয়।” তিনি আরও বলেন, ” এবারও মানুষের দুয়োরে ভোট ভিক্ষার ঝুলি হাতে দাঁড়াব। তাতে যাঁর ইচ্ছে হয় দেবে না হয় দেবে না।”
গোরাবাজারে শহিদ ক্ষুদিরাম পাঠাগারের শাখা কার্যালয়ই গত পাঁচ বছরে হয়ে উঠেছিল বিধায়কের কার্যালয়। বহরমপুরের ভূমিপুত্র কাঞ্চনের রাজনৈতিক হাতেখড়ি অধীর চৌধুরীর হাতে। তাঁর পূর্বসূরী মনোজ চক্রবর্তীর বিধায়ক হিসেবে জীবন যাপন ছিল সাদামাটা। যা ছিল তাঁর অন্যতম ইউএসপি। পরিবর্তনের বাংলায় শাসকদলের নেতাদের যখন ” মাটিতে পা পড়ে না “, সেই সময়ও মনোজ চক্রবর্তীর জীবনের যাপন চিত্র বদলায়নি। সচেতন কাঞ্চন সেই যাপনেই নিজেকে দীক্ষিত করেছিলেন। বিধায়ক সুলভ আচরণের থেকেও প্রাধান্য দিয়েছেন সাধারণের একজন হতে।
ধর্মীয় মেরুকরণকে সামনে রেখে ২০২১ এর নির্বাচন যুদ্ধে নেমেছিল বাংলা। অনেকেই দাবি করেন, তার ফল পেয়েছিল বিজেপি। যদিও কাঞ্চন ছিল ব্যতিক্রম এমন দাবি করেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা। গত পাঁচ বছরে বাংলা বারবার সরব হয়েছে শাসক দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কিন্তু বিজেপি তাকে হাতিয়ার না করে পরোক্ষে তৃণমূলকে অক্সিজেন দিয়েছে বলে দাবি করেছেন কংগ্রেস, সিপিএমের মতো রাজনৈতিক দলগুলি। তাহলে কাঞ্চনের লড়াই কার বিরুদ্ধে? তৃণমূলের নাম না করে ” চোর, চিটিংবাজ, মাফিয়া যারা রাজ্যটার ক্ষতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে” বলে দাবি করেন কাঞ্চন।
তারা কারা ? কাঞ্চনের উত্তর ” যাঁরা এই কাজ করেছে তারাই।”
তৃণমূলকেই দুষছেন? কাঞ্চন বলেন, ” তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম যাঁরা রাজ্যের মানুষকে বিপদে ফেলেছে এদের সবার বিরুদ্ধেই আমার লড়াই”
ভোটের ইস্যূ কী? এবার বিধায়ক বলেন, ” তৃণমূলের পতন। যাঁরা রাজ্যের মানুষকে যন্ত্রণায় রেখেছে, যাঁদের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। হাঁসফাঁস করছেন এই অত্যাচারীর হাত থেকে রেহাই পেতে, তাদের রাজ্য থেকে উৎখাত করাই আমাদের একমাত্র ও অন্যতম ইস্যূ।”
২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে ইউসুফ পাঠানকে প্রার্থী করে বাজিমাত করেছে তৃণমূল। সেই ভোটে বিজেপির চিকিৎসক প্রার্থী নির্মল সাহা ২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তিন নম্বরে খেলা শেষ করেছিলেন। অথচ তাঁরই ছিল প্রথম হওয়ার কথা। যুক্তি ছিল ধর্মীয় মেরুকরণের দরুণ লোকসভায় বহরমপুরে জিতেছে তৃণমূল।
সেই তৃণমূলের এবারের অস্ত্র এসআইআর। জেলার ১১ লক্ষ ভোটার এখনও বিবেচনাধীন। তবু বিজেপিরই বহরমপুর বিধানসভার প্রার্থী কাঞ্চনকে মানুষ ভোট দেবে কেন ? নির্মল বলেন, ” এবারের নির্বাচন রাষ্ট্রবাদী মানুষদের জীবন মরণ লড়াই। তাই বাঁচার তাগিদে মানুষ পদ্ম ফুলকেই ভোট দেবেন কোনও ব্যক্তি দেখে নয়।” কঞ্চনের পক্ষ নিয়ে তিনি বলেন, ” বিরোধী দলের বিধায়ক বলেই কাঞ্চনের হাত পা বেঁধে রেখে মানুষের কাজ করতে বাধা দিয়েছে শাসকদল। মানুষ তা জানে। আর জানে বলেই এবার রাজ্যে পরিবর্তন আনতে বিজেপিকেই ভোট দিতে হবে।”
নির্মলের সঙ্গে ভোট যুদ্ধে নামা বহরমপুরের পাঁচ বারের সাংসদ অধীর চৌধুরী বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইয়ে কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন বলে জল্পনা। যাঁকে কাঞ্চন ” মামা ” বলে ডাকেন। তবে মামা ভাগ্নের লড়াইয়ে কাঞ্চন নিজেকে এগিয়ে রেখে বলছেন, ” পাঁচবারের সাংসদ, রেলমন্ত্রী, পিএসি-র চেয়ারম্যান যদি লোকসভায় জিততে না পেরে ক্ষমতা ফিরে পেতে নির্বাচনে লড়াই করেন তাহলে মানুষই তাঁকে জবাব দেবে। তিনি যদি ভাবেন বহরমপুর এখনও তার গড় তাহলে ভুল হবে। বহরমপুর পাল্টে গিয়েছে। মানুষ জানে সরকার তো গড়বে হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি। কংগ্রেস তো নয়।”