
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ বহরমপুর স্টেশনই হোক কিংবা জনবহুল বাসস্ট্যান্ড একদন্ড দাঁড়ালেই বেসরকারি হাসপাতালের ঝাঁ চকচকে ভবন আর পরিষেবা দেওয়ার গালভরা বিজ্ঞাপণে মুখ ঢেকে যায় আকাশের। অথচ রোগীর প্রাণ বাঁচাতে ভরসা সেই সরকারি হাসপাতাল। তথ্য বলছে মুর্শিদাবাদে এমন নজির একটা নয়, অনেক। ফের সে কথার প্রমাণ দিল মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
সম্প্রতি সাগরপাড়ার বাসিন্দা রিম্পা মন্ডল একসঙ্গে চার সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। যা নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন চিকিৎসকরাও। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া ওই চার সদ্যোজাতের ওজন কম থাকায় তাদের শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের জন্য কোনও ব্যবস্থা ছিল না ওই বেসরকারি হাসপাতালের। অন্যথায় শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে পাঠানো হয় মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ঘটনাটি ঘটেছে ফেব্রুয়ারী মাসের ১৭ তারিখ। ২ মার্চ তাঁদের সুস্থ করে বাড়ি পাঠিয়েছে ওই সরকারি হাসপাতাল। সে কথা জানিয়ে হাসপাতাল ছাড়ার সময় চিকিৎসক নার্সদের ধন্যবাদ দিয়ে যান পরিবারের লোকজন।
কী হয়েছিল ওই সদ্যোজাতদের? ওই হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ভোলানাথ আইচ বলেন, ” চারটি সন্তান, দু’জন পুত্র ও দু’জন কন্যার ওজন ছিল এককেজি দুশো’র মধ্যে। ফলে শ্বাসকষ্ট সহ নানান শারীরিক অসুবিধা ছিল। প্রাণের সংশয়ও ছিল দু’জনের। তখন তাঁদেরকে এসএনসিইউতে ভর্তি করানো হয়। মা হাসপাতালে ভর্তি থাকায় আসতে পারেন নি।” চারটি সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো কিংবা ওম দেওয়ার জন্য নার্সদের পাশাপাশি মায়ের অভাব মেটাতে পরিবারের তিনজনকে হাসপাতালে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রায় পনেরো দিন ধরে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও পরিবারের যৌথ পরিষেবায় প্রাণে বেঁচে যায় ওই সদ্যোজাতরা। ওদের নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে দাবি করেন ভোলানাথ। তিনি বলেন, ” অবশেষে তাদের সুস্থভাবে বাড়ি পাঠাতে পেরে স্বস্তি বোধ করছি।”
মাঝে মধ্যেই খারাপ খবরে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চলে আসে সংবাদ শিরোনামে। স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালে যেতে প্রাথমিকভাবে দ্বিধা থাকে রোগীর পরিবারের। তখনই তাঁরা দ্বারস্থ হন বেসরকারি হাসপাতালের। কিন্তু সেখানে রোগ জটিল হলে বিশেষ করে গর্ভবতী মা কিংবা সদ্যোজাত শিশুর, পকেটের পয়সা জলের মতো খরচ করেও যখন মেলেনা পরিষেবা তখন রিম্পার মতো মায়েরা ছুটে আসেন সরকারি হাসপাতালে। রিম্পার এক আত্মীয় বিশ্বজিৎ মন্ডল একমত হয়ে বলেন, ” পাঁচ মাস আগে আমার নিজের বোনের সন্তানের জন্ম হয়েছে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। মাসির মেয়েকেও সে কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারের লোকজন তা শোনেন নি।”
মুর্শিদাবাদে এই মুহুর্তে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা কত তার হিসেব দিতে হিমসিম খান স্বাস্থের দায়িত্বে থাকা জেলা আধিকারিকরা। বহরমপুরের বাসিন্দা বাবলু হালদার বলেন, ” এখন অলিগলিতে হাসপাতাল, পরিষেবার মূল্য আকাশ ছোঁয়া কিন্তু পরিষেবা শূন্য। এ বড় উদ্বেগের।”
বাংলায় পরিবর্তনের জমানায় মা ও শিশুর কথা চিন্তা করে উন্নত পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল মাতৃ মা। গঠে উঠেছে এসএনসিইউয়ের মতো উন্নত বিভাগ। আধুনিক যন্ত্রপাতাতি চালানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে দক্ষ কর্মীও। আর নিখরচায় সেই পরিষেবা পান রোগীর পরিবার। তবে সে কথা সাধারণ মানুষের অগোচরেই থেকে যায়। এরজন্য পরোক্ষে সরকারকেই দায়ি করছেন কেউ কেউ। আর এক বাসিন্দা বিকাশ দেবনাথ বলেন, ” এর জন্য সরকারের আরও সচেতনতার পাশাপাশি মানুষকে জানাতে বিজ্ঞাপণ দেওয়া দরকার।”