
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ পাঠক শুধুই কি বইয়ের খরিদ্দার হয়ে আসেন মেলায়? কতশত জনের কাছে এই মেলা হয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের জায়গা। এখানেই ফেসবুক, টুইটারকে দশ গোল দিয়ে দেয় বইমেলা। অধ্যাপক পম্পি সিদ্ধান্তও তেমনই একজন। ঠিক করেছিলেন বইয়ের জন্ম দেবেন। কোনও সাজানো ঝাঁ চকচকে বারান্দায় নয়, মানুষের ভিড়ে ঠাসা বইয়ের মেলায়। শনিবার ছিল তেমনই দিন। মেলার টানে ভিড় করে এসেছিলেন বইপোকা ছাড়াও সাধারণ পাঠক। তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রবি প্রকাশনীর স্টলের সামনে তাঁর লেখা তিনটি ইতিহাস নির্ভর প্রবন্ধের একটি বইয়ের মলাট উন্মোচনের ভার দিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের ইতিহাস সমীক্ষক রমাপ্রসাদ ভাস্করের হাতে। সঙ্গ দিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার অতিরিক্ত জেলা শাসক (উন্নয়ন) চিরন্তণ প্রামাণিক আর জেলা গ্রন্থাগার আধিকারিক অমিত সাহা।
সূর্যের আলো নিভু নিভু হয়ে এলে বইমেলায় জ্বলে উঠছিল হাজার ওয়াটের সাদা আলো। রাঙা আলোয় মায়াবি বিকেলের ব্যালকনি, মূল মঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবেতেই আলো পড়ছিল মানানসই। আলো পড়বার কথা ছিল মুর্শিদাবাদের মতো ইতিহাস নির্ভর জেলার কোণাতেও। ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসা সেই ইতিহাসের অধিকাংশ জায়গায় আলো জ্বলেনি সরকারি উদ্যোগে। সেখানে আলো ফেলেছেন রমাপ্রসাদ ভাস্করের মতো মানুষেরা।
রমাপ্রসাদ কোনওদিন গবেষণার জন্য অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে লেখেননি মুর্শিদাবাদের ইতিহাস। তাঁর কৌতুহলী মন ছুটে গিয়েছিল জেলার কোণে কোণে। তাঁর লেখা জনপ্রিয় হয়েছে। সেই দলে নাম লেখালেন পম্পি? এমন প্রশ্নেই অবশ্য দোল খেয়েছেন মলাট উন্মোচনে অংশ নেওয়া মানুষ থেকে পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে উঁকি মারা বইপ্রেমিকও। রবি প্রকাশনীর স্টলে দাঁড়িয়ে নবজাতককে নাড়াচাড়া করে দেখলেন কেউ কেউ। কেউ কিনলেন, কেউ হাত বুলিয়ে রেখে দিলেন। পম্পির বই অবশ্য মুর্শিদাবাদকে ঘিরে নয়। প্রাচীনকাল নিয়ে। আর তা নিয়ে গবেষণা করতে এসে তিনি লিখে ফেলেছেন গবেষণা ধর্মী তিনটি প্রবন্ধ। তাদের মলাট বন্দি করে নাম দিয়েছেন “হিস্ট্রি মিস্ট্রি”।
তাঁকে এই বই লিখতে যিনি উৎসাহ জুগিয়েছেন সেই অধ্যাপক শৈবাল রায় বইয়ের পেছনে লিখে দিয়েছেন, ” যাঁরা ইতিহাস চর্চার মানুষ নন, ইতিহাস উৎসাহী, কিংবা শুধু ইতিহাস কেন, বিজ্ঞান, শিল্পতত্ব, সমাজবীক্ষা সব ধরনের মানুষেরই ভালো লাগবার কথা এই বই।” তাই কিনেছেন জনা চল্লিশের কাছাকাছি মানুষ, তথ্য এমনই।
মকর সংক্রান্তির আগে শীত শেষ কবে যে এমন কামড় দিয়েছিল পৌষের গায়ে মনে পড়ে না তেমন কারও। সূর্যের তেজও ম্লান, ধোঁয়া ধুলোর ‘আধুনিক’ শহর বহরমপুরে। আর সেখানেই বসেছিল বইয়ের মেলা। নীল-সাদা কাপড়ে মোড়া বাঁশ আর কাঠের তক্তা দিয়ে গড়া ছোট ছোট দোকানে সাজানো নতুন নতুন বই। কোনওটি চেনা, কোনওটি অচেনা। তার গন্ধই আলাদা। সেই বই ঘিরেই দানা বাঁধে রহস্য, ইংরেজিতে মিস্ট্রি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ছেড়ে ব্যারাকস্কোয়ারের সেই মেলায় মানুষের আসা যাওয়া লেগে ছিল গত সাতদিন ধরে। আজ শেষ বেলায় তাই মন ভার সেই মানুষগুলোর, যাদের বই বড় প্রিয়। আবার ফেরা সেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। সেখানেই কোনও পাঠক হয়তো তাঁর দেওয়ালে রহস্য উন্মোচন করবেন “হিস্ট্রি মিস্ট্রি”-র। আপাতত এখানেই বিরতি।