এ আই জমানাতেও কেন বোমা বাঁধে ডোমকল ?

Social Share

সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ ডোমকলে আজ হয় বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, না হয় বোমা উদ্ধার হচ্ছে মহকুমার আনাচে কানাচে। তটস্থ পুলিশ। আর সেই পুলিশকে ‘বাইপাস’ করেই ডোমকলে বোমার সুতলি পাকায় দুষ্কৃতিরা। তেমনি গোপন আস্তানায় তৈরি হয় বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র। আর বারবার সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবারেও বোমা বাঁধতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক যুবকের। আর এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগেও বাংলাদেশ ঘেঁষা মুর্শিদাবাদের এই মহকুমার একাংশ মানুষের আজও কেন পেট চালাতে হয় বোমা বেঁধে? উঠছে প্রশ্ন?

বর্তমান পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এলাকায় ঠিকই। তবে পুলিশ মহলের দাবি, ১৯৯২-৯৩ সাল নাগাদ জেলার প্রাক্তন পুলিশ সুপার অনিল কুমারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। বেআইনি অস্ত্রকারবারীদের উদ্দেশ্যে রীতিমতো এলাকায় ঘুরে নিজেই মাইকে ঘোষণা করেছিলেন-“আমি মুর্শিদাবাদের এসপি অনিল কুমার বলছি , এক বনে দুই শের থাকতে পারে না। হয় সে থাকবে না হয় আমি থাকব। সাত দিনের মধ্যে অস্ত্র সহ থানায় হাজিরা দিন। নয়তো…”

ইতিহাসের পাতায় অবশ্য ডোমকলের খ্যাতি আছে লড়াই আন্দোলনের। জোতদারের জমি ছিনিয়ে কৃষকের মধ্যে সেই জমি বিলিয়ে দেওয়ার কথা লেখা আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। সিপিএমের আব্দুল বারী আর কংগ্রেসের এক্রামূল বিশ্বাসের এলাকা দখলের লড়াই আজও ভোলেনি ডোমকলের মানুষ। ১৯৭৭ থেকে ২০১৬ একচেটিয়া সিপিএমের দখলে থাকা এই সীমান্তবর্তী এলাকা আজ তৃণমূলের দখলে। মহকুমায় বেড়েছে শিক্ষার হার। স্কুলের পাশাপাশি হয়েছে কলেজও। এলাকা চিহ্নিত করে তৈরি হয়েছে পুরসভা। তৈরি হয়েছে পাকা ছাদ। আছে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল। দিন দুয়েক আগে পথ চলা শুরু হয়েছে ডোমকল মহকুমা আদালতেরও। মানুষের হাতে হাতে মুঠো ফোন।

সম্প্রতি এই ডোমকল মহকুমার দুই যুবক ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছে। তবু এই এলাকার একাংশে জমাট বেঁধেছে অন্ধকার। সেই অন্ধকার সড়কেই বোমা বাঁধা থেকে পাচার সব চলে অনিয়ন্ত্রীত ভাবে, প্রশাসনের মদতেই, এমন দাবি উঠছে জিজ্ঞাসাবাদে। এলাকার মানুষের আয়ের মূল উৎস আজও চাষাবাদ। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কাজের সন্ধানে আজ অবশ্য ভিন রাজ্যে যায়। তাঁদের আয়ে সচ্ছল হয়েছে গ্রাম। কিন্তু স্থানীয় ভাবে আয়ের উৎস তৈরি হয়নি। চাষেও আর লাভ তেমন হয় না। তাই অসহায় হয়ে অন্ধকার জগতেই পা বাড়াতে হয় সমর্থ যুবাদের, দাবি স্থানীয়দের।

ডোমকল আইন কলেজের অধ্যক্ষ সামসুল আলম বলছেন, ” রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দ্যেশে ভূমি আন্দোলনের সময় কুশাবাড়িয়া ও তার আশেপাশের এলাকাবাসীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। এলাকা দখলের সময় এখানে কংগ্রেস সিপিএমকে লক্ষ্য করে গুলিও ছুড়েছে ১৯৭৭ এ। আর সেই সবই ডোমকলের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে সহিংসতার দিকে।”

তিনি বলেন, ” এখানে শিক্ষার হার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু স্থানীয় ভাবে রোজগারের তেমন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে নি। শিল্প নেই, কারখানা নেই। মানুষ রোজগার কী করবে?” সেই কারণেও এলাকার মানুষ বোমা তৈরির মতো দুষ্কর্ম করে থাকেন বলে তাঁর অনুমান।

ডিওয়াইএফের রাজ্য সম্মেলন উপলক্ষে কাজ ও সম্প্রীতির যাত্রা শুরু করেছে জেলা জুড়ে। প্রচার পর্বের শেষ ধাপে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডোমকলে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে সভা মুখ করে একটা সমাবেশ করে ডিওয়াইএফ। ওই সমাবেশে সংগঠনের নেতারা কাজের দাবি তুলেছেন। স্থানীয় সিপিএম নেতা ও প্রাক্তন যুব নেতা মুস্তাফিজুর রহমানও মূলত বেকারত্বই যে ডোমকলের সংস্কৃতি বদলানোর মূল বাধা তাও স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ” চাকরি নেই, বাকরি নেই, বেকাররা হা হা কার করছেন। ডোমকলে হাজার হাজার বেকার ছেলেমেয়ে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছে।” মীনাক্ষী বলেন, ” এর আগে আমাদের ১৯ টা রাজ্য সম্মেলন হয়েছে। সেখানে কাজের দাবি তুলেছিলাম, কারখানা তৈরির দাবি তুলেছিলাম। আমারা দাবি করেছিলাম একশো দিনের কাজ গ্রাম ও শহরেও চাই। কাজ করার অধিকারকে সংবিধানে স্বীকৃতি দিতে হবে। কাজের দাবির পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির দাবি করেছি। ডোমকলে রাস্তা, নালা, পার্ক বানাতে হবে এই দাবিও আমরা করেছি।”

তবে এখন এসবের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে ধর্ম। তাই তাঁদের কাজের দাবির পাশাপাশি সম্প্রীতির দাবিও তুলতে হচ্ছে বলে এদিন সমাবেশে দাবি করেছেন এই যুবনেত্রী। এলাকার শাসক বিরোধী রাজনৈতিক দলের দাবি, কাজ দিতে না পেরে শাসকদল ব্যক্তি স্বার্থে বোমা বানানোর মশলা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে আবালবৃদ্ধ বনিতার হাতে। কংগ্রেস নেতা তথা আইনজীবি রবিউল ইসলাম বলেন, “ক্ষমতায় টিকে থাকতে এখানে দুষ্কৃতিকে কাজে লাগানো হয়। সামান্য অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিম্নরুচি সম্পন্ন এবং অযোগ্য নেতৃত্বের প্ররোচনার ফাঁদে পা দিয়ে এখানকার মানুষজন এই কাজে যুক্ত হয়। যাদের অধিকাংশই অপেশাদার।”

জলঙ্গী নিবাসী তৃণমূলের এক বর্ষীয়ান নেতা অবশ্য বলছেন, ” সবই বুঝলাম। কিন্তু ৩৪ বছর ধরে ডোমকলের সংস্কৃতি বদলাতে পারেনি কেন? সেই উত্তরটা ম্যাডাম কী দেবেন?” সামসুলও বলেন, ” শুধু ডোমকল নয়, আজ গোটা রাজ্যই গণতন্ত্রের বদ্ধভূমিতে পরিণত হয়েছে। দুর্ভাগ্য শুধু ডোমকলের নাম থেকে গিয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights