
দিশারি মালাকারঃ “ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়? বরকতের রক্ত।” প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর আজ প্রথম একুশে ফ্রেব্রুয়ারি। মাতৃভাষা দিবস। আল মাহমুদের লেখা এই কবিতাটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। সদ্য প্রয়াত গায়কের এই গানটিও বিখ্যাত হয়েছে সৃষ্টির পর থেকে।
একটা সঙ্গীত কখন গণসঙ্গীত হয়। যে গানে গণের, শ্রমজীবী মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা, লড়াই,সংগ্রাম,ভালোবাসার কথা আছে তাকে গণসঙ্গীত বলে। সেই অর্থে প্রতুল মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন গণসঙ্গীত শিল্পী। শনিবার তাঁর মৃত্যুর পর আমার যেন মনে হল এই ধারার সঙ্গীতে একটা বড় রকমের শূন্যতা তৈরি হল।
ব্রীহি সাংস্কৃতিক সংস্থার হয়ে যেখানে যতবার গিয়েছি প্রাথমিকভাবে গণসঙ্গীত গাইতে গিয়ে তাঁর লেখা ও সুরের গানগুলিও আমাদের বাছাই তালিকায় থাকত। তার একটি গান ডিঙা ভাসাও রে সাগরে ( ডিঙ্গা গেয়েছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায় ), আমরা গাইতাম। এই যে গান ” পাল তুলে দাও, হাল ধরো হাতে/ দুস্তর সাগর হবো পার/ জাগায়ে মাতন ঢেউয়ের নাচন/ মরণ-বাঁচন একাকার” এই গানের কথায় বুকের ভেতরে একটা কোথাও উথাল পাথাল করতো। ওই গানেই ছিল ” পুবের আকাশ রাঙা হলো, সাথী
ঘুমায়ো না আর, জাগো রে।”
হতাশার সময় মনে আর পাঁচটা গণ সঙ্গীতের মতো তাঁর গান আশার আলো দেখাত। মনে হতো এই গানের কথায় ভর করে শত সহস্র মানুষকে ভরসা দেওয়া যায়। এই মানুষটিকে প্রথম দেখি কত সালে? তা মনে নেই। মনে আছে বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে দাঁড়িয়ে একা একজন মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টার গেয়ে যাচ্ছেন আর মানুষ শুনছেন। সেই শোয়ের একটি গান আজ সবার মুখে মুখে ঘুরছে। “আমি বাংলায় গান গাই/ আমি বাংলার গান গাই / আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।” প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজ আইডেন্টিটি।
লোক সঙ্গীত আর গণ সঙ্গীতের মধ্যে একটা তফাত আছে। এই গণসঙ্গীত অনেকেই লিখেছেন। যেমন সলীল চৌধুরী, নিবারণ পন্ডিত অনেকেই ছিলেন। যথার্থই ছিলেন। সুরেশ বিশ্বাস বা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কথাও বলা যায়। সুরেশ বিশ্বাসের খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। জনপ্রিয় ছিল হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান। কিন্তু তারপরে গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে একটা বড় শূন্যতা তৈরি করেছিল। আমাদের প্রজন্মের কাছে সেই শূন্যতা ভরিয়ে দিয়েছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। আমরা যারা অন্যরকম চেতনা থেকে সাংস্কৃতিক কাজ করতে নেমেছি। এবং আমরা যারা মনে করি একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন করছি তাদের কাছে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের একটা অনবদ্য অবদান ছিল। এবং মানুষটাও।
কবীর সুমন এই গায়ক সম্পর্কে লিখেছিলেন এই রকম,”লোকটা নিজেই একটা গান,আস্ত গান লোকটা নিজেই”। একজন ছোটখাটো মানুষ যিনি তখন গান করছেন মানে গান তো করছেন না তার গলাতেই যেন গানের আনুষঙ্গিক সংগত আছে। কোনও মিউজিক নেই। হারমোনিয়াম, তবলা ইত্যাদি নিয়ে গণসঙ্গীত গাইতে দেখেছি। কিন্তু এইবার একটা এমন ধরনের গণসঙ্গীত এলো যেখানে হারমোনিয়াম নেই, তবলা নেই একা একজন মানুষ একা গেয়ে গেলেন।
গণসঙ্গীত একসাথে গাওয়া হচ্ছে, এটা আমরা শুনে অভ্যস্ত। সেটাও বদলে গেল। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান একক কিন্তু তার অভিঘাত ছিল গণের মধ্যে। এটা একটা বড় প্লাস পয়েন্ট প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের। যেমন একটা শ্লোগান ‘হাট মিটিংয়ে চোঙা ফুঁকেছি/ গেট মিটিংয়ে গলা ভেঙেছি/ চিনছি শহর গ্রাম/ স্লোগান দিতে গিয়ে আমি সবার সাথে আমার দাবি প্রকাশ্যে তুললাম..’। এই কথাগুলো কিংবা “বেচো না বেচো না বন্ধু, তোমার চোখের মণি” কী অভিঘাত। আমাদের কাছে চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানে।
এই মানুষটিই ২০১১ সালের পর বদলে গেলেন। প্রতুল মুখোপাধ্যায় পরবর্তীতে কোন গান লিখেছিলেন আমি জানিনা।২০১১ র পর থেকে তার গান আর তিনি পৃথক হয়ে গেলেন। সব সরকারি মঞ্চে থেকে সরকারি দলের মঞ্চে থেকে ওঁর জীবন খুব বদলে গিয়েছিল তাও নয়। কিন্তু তাঁর সেই সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতে কষ্ট হয়। আর কষ্ট হয় বলেই গত শনিবার তাঁর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া ইস্তক কেমন যেন একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে নিজের মনের কাছে।
( লেখক একজন সঙ্গীত শিল্পী ও অভিনেত্রী, ব্রীহি সাংস্কৃতিক সংস্থা)