শুভাশিস সৈয়দঃ লেখার শুরুতেই দুটো কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিই–১) আমি অধীর চৌধুরীর লোক নই আর ২) খবর, সে যে কোনও খবরই হোক না কেন, তার বিকৃতি ঘটানোর বিপক্ষে আমি।
এই ‘ডিসক্লেমার’ দিয়ে লেখা শুরুর কারণ হলো– সম্প্রতি কোনও এক টিভি চ্যানেলের মুর্শিদাবাদ জেলা প্রতিনিধি’র এক প্রশ্নের জবাবে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী অধীর চৌধুরী’র ‘মেজাজ’ হারানো এবং মুখের দিকে এগিয়ে দেওয়া সেই চ্যানেলের বুম ধরে অধীরবাবু’র টানাটানি করা (ভিডিওতে যা দেখানো হয়েছে), যা ভাইরাল নেট পাড়ায়।
এখন অধীর চৌধুরীকে কি এমন প্রশ্ন করেছিলেন সেই জেলা প্রতিনিধি, সেটা জানা যেমন প্রয়োজন আমাদের, তারও আগে কোন প্রেক্ষাপটে ও কোন প্রেক্ষিতে ওই জেলা প্রতিনিধি প্রশ্ন করেছিলেন, সেটাও জেনে নেওয়া জরুরি। সম্প্রতি জঙ্গীপুরের লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী মুর্তজা হোসেন ওরফে বকুল হয়ে ভোট প্রচারে লালগোলায় গিয়েছিলেন অধীরবাবু। সেই মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার সময়ে অধীর চৌধুরী ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এবং বিজেপি দলের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হওয়া প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। আমরা সকলেই জানি গত বিধানসভা নির্বাচনের মুখে প্রধানমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ দিল্লি থেকে আগত বিজেপি দলের একের পর এক নেতা বাংলায় ভোট প্রচারে এসে সিএএ/এনআরসি লাগু করার জিগির তুলে ভোট ভাগের চেষ্টা করেন এবং সফলও হন। ভোটের ফল প্রকাশ হলে দেখা গিয়েছিল বিজেপি তিনটি আসন থেকে বাড়িয়ে ৭৭টি আসন দখল করে। শাসক দল তৃণমূল জয়ী হয়েছিল ২১৫টি আসনে। বাম ও কংগ্রেস কোনও আসনে জয়লাভ করেনি।
আসন্ন লোকসভা ভোটের মুখে ওই প্রসঙ্গের অবতারণা করে লালগোলার মঞ্চ থেকে অধীর বলেন, “সিএএ এবং এনআরসি লাগু হতে পারে এই আশঙ্কায় ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে এক পক্ষ মনে করেন টিএমসিকে ভোট দেওয়া উচিত। অন্য এক পক্ষ মনে করেন, টিএমসি নয় বিজেপিকে ভোট দেওয়া উচিত।” আর অধীরবাবু তো ভুল কিছু বলেননি। বাস্তব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ঠিক তথ্য ভোটারদের সামনে পরিবেশন করেন তিনি।
এর পরেই বিশেষ এক টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ, যার মালিককে ‘শুনতে’ পছন্দ করেন খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী, সেই চ্যানেলের লোকজন অধীর চৌধুরীর ভাষণের প্রক্ষিপ্ত অংশ কেটে তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে এমন ভাবে সম্প্রসারণ করলেন, যা দর্শক-শ্রোতাদের শুনে মনে হবে আসন্ন লোকসভা ভোটে অধীরবাবু ‘টিএমসি নয় বিজেপিকে ভোট দেওয়া’র পক্ষে সওয়াল করছেন!
হায় রে সাংবাদিক! হায় রে সাংবাদিকতা! যেখানে অধীর চৌধুরী বহরমপুর থেকে জয়ী হয়ে পাঁচ বার সাংসদ হয়েছেন। যেখানে তিনি লোকসভার বিরোধী দলনেতা আবার একই সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি। সেই সঙ্গে এ বারের লোকসভা ভোটে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে তিনি লড়ছেন এবং বহরমপুরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন ভোট প্রচারে। সেই তিনি কিনা ভোটের মুখে ‘বিজেপি-কে ভোট দেওয়ার’ নিদান দেবেন!! পাগলও নাকি নিজের ভাল বোঝে! সেখানে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবে, তাও কিনা দুঁদে রাজনীতিবিদ অধীর চৌধুরী! এটাও মানতে হবে! তৃণমূলের ভোট পড়বে বিজেপি-তে আর বিজেপি’র নিজস্ব ভোট, তাও পড়বে বিজেপি প্রার্থীর ব্যালট বাক্সে (ইভিএমে)। তাহলে কি দাঁড়ালো–চ্যানেলের খবর অনুযায়ী অধীর চৌধুরী যে ডালে বসে আছেন, সেই ডাল কাটতে উদ্যত হয়েছেন! যে কথা শুনলে কত্তা ঘুড়াতেও হাসবে!
আরও পড়ুনঃ ‘শূন্যে’র ভিতরেও ঢেউ জলঙ্গীতে
লোকসভা ভোটের মুখে যা তিনি বলেননি, সেই কথা জোর করে তাঁর মুখে বসিয়ে দিয়ে অধীর চৌধুরীকে কোণঠাসা করার ঘৃণ্য চক্রান্ত রচনা করার পিছনে কোন মতলব রয়েছে, তার উত্তর একমাত্র ওই চ্যানেল কর্তৃপক্ষ দিতে পারবেন!! না হলে ভাইরাল হওয়া ভিডিও যাচাই করার রাস্তায় হাঁটতেন তাঁরা। তা না করে তথ্যের অপলাপ ঘটিয়ে খবর সম্প্রসারণ করে ক্ষান্ত না হয়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ এ বার ময়দানে নামিয়ে দেয় তাদের জেলা প্রতিনিধিকে!
কংগ্রেস এক কর্মীর মোটরবাইকের পিছনের আসনে বসে যখন অধীর চৌধুরী যাচ্ছিলেন বহরমপুরে নিজের ভোট প্রচারে। সেই সময়ে চলন্ত মোটরবাইকের সামনে অধীরবাবুর মুখের কাছে চ্যানেলের লোগো লাগানো বুম ধরে একই কায়দায় বিকৃত প্রশ্নের অবতারণা করেন সেই প্রতিনিধি। তখন পিছন ফিরে অধীরবাবু সেই প্রতিনিধিকে জানান, তাঁর পুরো ভাষণ শুনতে। এর পরেই মুখের সামনে থেকে হাত দিয়ে বুম সরিয়ে দিতে দেখা যায় অধীরবাবুকে (ভিডিওতে যা দেখা গিয়েছে) এবং পরে তিনি মোটরবাইকে চড়ে ভোট প্রচারে বেরিয়ে যান।
দীর্ঘদিন মুর্শিদাবাদ জেলায় সাংবাদিকতা করার সুবাদে কোনও দিন দেখিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অধীর চৌধুরীকে মেজাজ হারাতে। তাহলে এখন কেন মেজাজ হারাচ্ছেন? উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। সম্প্রতি অধীর চৌধুরী বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে বহরমপুরে জেলা প্রশাসনিক ভবনে গিয়েছিলেন মনোনয়নপত্র জমা দিতে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে তিনি বিভিন্ন দফতর ঘুরে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা করেন, এটা তিনি করে থাকেন। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সেই সময়ে প্রশাসনিক দফতরের এক চুক্তিভিত্তিক মহিলা কর্মী অধীর চৌধুরীকে আবেগে জড়িয়ে ধরে জানান, আজ তাঁর জন্মদিন। সে কথা শুনে অধীরবাবু মানিব্যাগ থেকে বের করে কিছু টাকা দেন জন্মদিনের আনন্দ ভাগ করে নিতে। এখন সেখানে উপস্থিত এক প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মী তিনি আবার ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দেওয়া জেলখাটা মালিকের টিভি মিডিয়ারও কর্মী, সেই তিনি যে খবর করেন তার সারমর্ম হলো–ভোটের মুখে টাকা বিলিয়ে ভোট খরিদ করছেন অধীরবাবু।
ভাবুন। ভাবুন। ভাবা উচিত কেন মেজাজ হারাচ্ছেন অধীর চৌধুরী! যদিও যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি আসুক না কেন, তা ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবিলা করা উচিত প্রবীণ সাংসদেরও। যেমন করে এর আগে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলা করার সৎ সাহস দেখিয়েছেন তিনি।
মনে পড়ে প্রায় দেড় দশক আগে ভাগীরথী সমবায় দুগ্ধ উৎপাদক সমিতি’র ভোটে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের তৎকালিন ডেপুটি পুলিশ সুপার সাহাবুল হোসেনের নেতৃত্বে বহরমপুর থানার পুলিশ জেলা কংগ্রেস কার্যালয় লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সেই সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে কংগ্রেস কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় অবস্থান বিক্ষোভ দেখান অধীর। লাঠি ভূতের মোকাবিলা করেছিলেন তাও তো মাথা ঠাণ্ডা রেখেই।
আসলে অন্য জেলায় সংখ্যালঘু যারা সেই তারাই মুর্শিদাবাদ জেলায় সংখ্যাগুরু। এখন ভোটের মুখে ‘বিজেপি-কে ভোট দেওয়ার’ ভুল বার্তা প্রচারিত হলে তার ভুল ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করবেন জেলার ভোটারেরা। তার ফল ব্যালট বাক্সে যে পড়বে না তাও নয়। ফলে চ্যানেল কর্তৃক ভুল খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার ব্যাপক প্রভাব যে ভোটারদের উপরে পড়বে এবং ক্ষতি যা হওয়ার জোটের উপরে পড়বে তা বোঝার জন্য রাজনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ফলে চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধির উপরে ক্ষোভ ঝরে পড়া অস্বাভাবিকও নয়।
আরও শুনুন–শক্তিপুরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হলো। যেখানে কংগ্রেস কোনওভাবেই জড়িত ছিল না। কিন্তু ঘটনার খবর পেয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে অধীর চৌধুরী আহতদের দেখতে গেলেন হাসপাতালে। সেখানে বিজেপির কেষ্টবিষ্টুদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আর সেই অধীর চৌধুরী বলবেন বিজেপিকে ভোট দিতে? আবার বহরমপুর শহরে ভোট প্রচারে বেরিয়ে ‘গো-ব্যাক’ শ্লোগান-সহ অশালীন ব্যবহার করার প্রতিবাদ জানালে বহরমপুর থানার পুলিশ ডেকে পাঠায় সাংসদকে!
ওই চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধিকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। এখন মিডিয়া জগতের যা অবস্থা তাতে ১০-১৫ হাজার টাকায় এই সমস্তদের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে বাধ্য করছে। আর এরাও বাধ্য হচ্ছে কলকাতায় ঠাণ্ডা ঘরে বসে থাকা সিনিয়রদের কথা মানতে। আর সেই সিনিয়র যাঁরা কোনও দিন ঘুরে দেখেননি মুর্শিদাবাদ জেলা। চেনেন না জেলার মাটি। রাঢ় আর বাগড়ি এলাকা কোনটা সেটাও জানেন না। জানেন না ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে সীমানা লাগোয়া মুর্শিদাবাদ জেলার অবস্থানের কাহিনি। এই একশ্রেণির অশিক্ষিত সাংবাদিকের দাপটে ত্রাহি অবস্থা দর্শক-শ্রোতা থেকে পাঠককূলের।
এখন সব দেখেশুনে নিজের মনে প্রশ্ন জাগছে-পুলিশ-প্রশাসন-একশ্রেণীর সাংবাদিক যখন সমবেত লেঠেল বাহিনী অধীর চৌধুরীর মতো এক জন জননেতাকে আটকাতে নেমে পড়ে, তখন মেজাজ হারানো কি অন্যায়? এর দায় কি শুধু যে মেজাজ হারাচ্ছেন তাঁর উপরে বর্তায়??
( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)