উদ্বোধন হল সান্টাফোকিয়ার কালীপুজোর

Social Share

সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ বহরমপুর শহর তখন রাজনীতির কালো ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েনি। রাজনীতি ছিল তখন রাজনীতির কারবারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাধারণ মানুষের গায়ে তার আঁচ লাগতো না। আমজনতাও পালে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। ফলে দুর্গাপুজোর চার দিন বহরমপুরের পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং উত্তর থেকে দক্ষিণের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে প্রতিমা দর্শন করতেন মানুষ। কিন্তু কালীপুজো এলেই বহরমপুরের সব রাস্তা এসে মিশে যেত গোরাবাজার জজকোর্ট লাগোয়া রাস্তায়!

ওই রাস্তার এক ফালি জমিতে স্যান্টাফোকিয়া’র কালীপুজোকে কেন্দ্র করে বহরমপুর শহরে তখন অন্য এক উন্মাদনা ছিল উৎসবপ্রেমী বহরমপুরের মানুষের মধ্যে। ওই কালীপুজোকে ঘিরে রাত গভীর পর্যন্ত মানুষের মাথার মিছিল চলত। এমনই এক বার প্রদীপ জ্বালিয়ে কালীপুজোর সূচনা করেছিলেন সাহিত্যিক মুর্শিবাবাদের ভূমিপুত্র সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। সে বছর উদ্বোধনের মঞ্চে ছিলেন বহরমপুরের ভূমিপুত্র বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপাচার্য সুজিত বসুও।

কালীমায়ের সামনে মুর্শিদাবাদের দুই সু-সন্তান সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও সুজিত বসুকে হাজির করে জেলার সম্প্রীতির ঐতিহ্যের মশাল ওই সন্ধ্যায় জ্বালিয়েছিলেন– তিনি অধীর চৌধুরী।

সময়ের পলি পড়ে ধুসর হয়ে যাওয়া চিত্র। অধীর চৌধুরী ও সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

পুজো সংখ্যার লেখা শেষ করে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর শেষে গ্রামের বাড়ি খোশবাসপুরে বেড়াতে আসতেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। সে বছরও এসেছিলেন। খবর পেয়ে অধীর চৌধুরী আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন পুজো উদ্বোধন করার জন্য। সেই ডাকে এতটাই আন্তরিকতা ও উষ্ণতা ছিল যে ‘না’ করতে পারেননি ‘অলীক মানুষ’এর স্রষ্টা। তখন ২০০১ সাল।

গোরাবাজার জজকোর্টের মোড়ে এখন যেখানে খাসির মাংস, রুটি-তরকারি, চায়ের দোকান রয়েছে, তখন সে সব ছিল না। ওখানেই অস্থায়ী গ্রীনরুম করা হয়েছিল। খোশবাসপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে নিজের গাড়িতে এসে বহরমপুরে পৌঁছন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। গাড়ি থেকে নামতেই তাঁকে নিয়ে গিয়ে বসানো হয় ওই গ্রীনরুমে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সুদৃশ্য কাপ-প্লেটে করে চা দিয়ে যান উদ্যোক্তাদের কেউ একজন। তখন সিগারেট ছাড়া থাকতে পারতেন না সিরাজ। চা শেষ করেই সিগারেট ধরিয়ে ফেললেন।

এর পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মণ্ডপের মধ্যে। সুজিত বসু সরাসরি মণ্ডপে হাজির হন। এ দিকে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজকে দেখে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেন অধীর। রাস্তায় তখন কাতারে কাতারে মানুষ। সেই জড়িয়ে ধরা দৃশ্য দেখে করতালিতে ফেটে পড়ে গোটা মণ্ডপ চত্বর। বহরমপুরের ‘রবিনহুড’ অধীর জড়িয়ে ধরে আছেন ‘আলকাপের ওস্তাদ’ সিরাজ মাস্টারকে–সে ছবি ক্যামেরা বন্দি করতে তখন হুড়োহুড়ি পড়ে যায় উৎসাহী জনতার মধ্যে। স্মারক হিসেবে সিরাজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল পিতলের কালীমূর্তি। সিরাজ নেই। কিন্তু সেই স্মারক আজও অক্ষত রয়েছে খোসবাসপুরের গ্রামের বাড়িতে।

স্মারক হিসেবে সিরাজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল পিতলের কালীমূর্তি।

এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না, সেটা হলো–জেলা জজ কোর্ট তখন পাঁচিল বন্দি ছিল না। কালীপুজো শেষে চার দিন ধরে ওই জজকোর্টের খোলা মাঠে চলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পুজোকে ঘিরে মেলা বসত ওই মাঠে। থাকত নাগরদোলা। যাত্রাপালা হত। নটি বিনোদিনী যাত্রায় অভিনয় করার জন্য এসেছিলেন কংগ্রেসের এক সময়ের কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ প্রতিমন্ত্রী অজিত পাঁজা। মুম্বাই-কলকাতার নামী শিল্পীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। ঊষা উত্থুপ, বাবুল সুপ্রীয়, মিস জোজোদের নিয়ে অনুষ্ঠান হয়েছিল ওয়াইএমএ ময়দানে। ফসিলস্ এসেছিল এনসিসি প্যারেড গ্রাউন্ডে।

স্যান্টাফোকিয়ার এ বছরের কালী প্রতিমা।

কোনও এক বছর জেলা জজ কোর্ট ময়দানে এসেছিলেন দেবশ্রী রায়। ‘কলকাতার রসগোল্লা’ গানের সঙ্গে নেচে মঞ্চে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিমা বিসর্জনের পরের দিন জজ কোর্ট মোড় থেকে নিমতলা যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে চেয়ার-টেবিলে বসে ভোগ খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিল। প্রায় ১০-১২ হাজার ভক্ত পাত পেড়ে বসে ভোগ খেতেন আর ভোগ বাড়ি বয়ে নিয়ে যেতেন আরও কয়েক হাজার ভক্ত।

আভিজাত্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেল ঘটিয়েছে ৪৭ বছরে পা রাখা ওই পুজো। বুধবার সন্ধ্যায় উদ্বোধন হয়েছে কালীপুজোর। কিন্তু এর মধ্যে ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। এখন আগের সেই জৌলুস না থাকলেও বহরমপুরের মানুষ এখনও কালীপুজো বলতে বোঝে ‘স্যান্টাফোকিয়া’র কালীপুজো তথা অধীরের পুজো। আর সেই টানেই প্রতি বছর বহরমপুরের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ভিড় করেন সেখানেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights