
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ রাজ্যস্তরের বৈঠক শেষে অপেক্ষায় থাকা সংবাদ মাধ্যমের সামনে গরমাগরম বক্তব্য রাখতে ভালবাসেন বঙ্গের তৃণমূল নেতারা। গত পনের বছর ধরে এই অভ্যাসেই অভ্যস্ত হয়েছেন বাঙালি। সোমবার ছবিটা ছিল কিঞ্চিত ভিন্ন। বলা বারণ, বলেই বহরমপুরের নেতাদের পেট থেকে কথা মুখে এসে আটকে যাচ্ছে দাঁতের কাছে এসে। কেউ আবার বলেই দিলেন “অপেক্ষা করুন। সব শুনতেও পারবেন। জানতেও পারবেন। কিন্তু একটা দলে তো কিছু নিয়ম আছে না কি? অন্তত রাতটা কাটাতে দিন।”
অভিষেকের সঙ্গে বৈঠকে হাজির ছিলেন বহরমপুর সংগঠনের বিধায়করা। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি জুড়ে ছিলেন গ্রাম শহরের নেতারা। ভরতপুর শিরোনামে থাকলেও অধিকাংশ ব্লকে বিধায়ক ও দলের ব্লক সভাপতির মধ্যে সম্পর্ক ভাল নয়। তার মধ্যে এক বিধায়ককে এদিন ফোন করে বৈঠকে সম্ভাব্য আলোচ্য প্রশ্নের কথা বলায় তিনি বলেন, ” আপনি যা বলছেন সবগুলিই এদিন আলোচনা হয়েছে। নেতা যা বলেছেন তাতে আমি আশাবাদী। কিন্তু কী আলোচনা হয়েছে সেটা প্লিজ জানতে চাইবেন না। আমাদের বাইরে বলা বারণ।”
সংসার থেকে পথঘাট, মানুষজনের মধ্যে এখন আন্তরিকতাও আসে কর্পোরেট মোড়কে। তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও চেয়েছিলেন দল চলুক কর্পোরেট ধাঁচে। কে কার কাছের না দেখে দক্ষতাই হোক শেষ মাপকাঠি। এমনকি নেতাদের বেশভুষা চালচলনও বদলাতে চেয়েছিলেন। আজও দলে তার একুশে আইন হয়ে রয়ে গিয়েছে। সেটাই কি বাস্তবে আসতে চলেছে? একটা ফুটন্ত ভাত টিপেই পুরো ভাত হওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতেও বৈঠক শেষে আবার বারণ করছেন মুর্শিদাবাদের নেতারা। সেক্ষেত্রে এক নেতার আবার দার্শনিক উক্তি, “অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয় বোঝেন না।” শাখা সংগঠনের এক নেতা নিজেকে ক্লাসের অমনোযোগী পড়ুয়ার সঙ্গে তুলনা টেনে বলেন “আমি দূরে ছিলাম। সব কথা কানেই ঢোকেনি।”
ক্যামাক স্ট্রিটে ডেকে তৃণমূলের দ্বিতীয় নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বোঝাতে চেয়েছিলেন এখন থেকে শুধু লোকসভাতেই দল চালাবেন না, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে দল চালাবেন তিনি। সুতরাং আর দিদিকে বলে দেবো গোছের কোনও কথায় দলের মান-চিত্রে রদবদল হবে না। অভিষেক চান, সংসারে অশান্তি হলে বকেঝকে দামাল নেতাদের সামলানো নয়, একেবারে পেশাদার কোম্পানিতে যে পদ্ধতিতে কাজ হয় সেই পদ্ধতিতেই চলুক তৃণমূল। আর তাতেই ধাক্কা খাচ্ছেন বহরমপুরের পুরনো নেতারা। তাই কোম্পানির মর্জি মাফিক মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে বৈঠক থেকে বেড়িয়েছেন বলে জানালেন তাঁদেরই কেউ কেউ। সেই লিউকোপ্লাস্টও ভেজাল বলে অবশ্য ফুট কাটলেন বহরমপুরে বিরোধী শিবিরের এক তরুণ নেতা।
একটা সময় তৃণমূলের মুর্শিদাবাদের সংগঠনে কোনও নেতা কোনও বড় পদে এলে তাঁর নিচু তলার নেতারা তাঁকে ঘিরে রাখতেন। জল চাইলে ঠান্ডা, হাওয়া চাইলে এসি, মুড়ি চাইলে চাইনিজ খাওয়ানোর চল ছিল। সম্মান পেতে পেতে হাঁফিয়ে উঠতেন সেই নেতা। কিন্তু যাঁরা তা করতেন তাঁদের সবাই মেয়াদের শেষদিন পর্যন্ত যে নেতার সঙ্গে থাকতেন তা নয়, মাঝপথেই মোহভঙ্গ হতো।
সে দিন গিয়েছে। সবাই নেতা হওয়ার দৌড়ে শামিল। কারও অভিমুখ কালীঘাট, কারও অভিমুখ ক্যামাক স্ট্রিট। কালকের পর থেকে কালীঘাটমুখী নেতাদের সামনে হঠাৎ গার্ড রেল পড়ে যাওয়ায় বর্ষার পিচ্ছিল রাস্তায় অভিমুখ বদলের হিড়িক পড়ে গিয়েছে। তা জেনে পুলিশের এক বড় কর্তার সহাস্য জবাব “বলবেন সাবধানে পা ফেলতে, নয়তো পিছলে গিয়ে বুড়ো বয়সে পাঁজর ভেঙে যেতে পারে।”
সবটা শুনে তৃণমূলের এক আদি নেতা বলেন, ” পোশাক বদলেছে, ক্যামেরার সামনে কায়দা করে অ্যান্ড্রয়েড ধরে পোজ দেওয়া হয়েছে নেতাদের ফ্যাশন। হাঁটার বদলে বাহারি পোশাকে চার চাকা গাড়িতে চড়ে জনসংযোগে জনতা আজ কাস্টমার হয়ে গিয়েছে নেতার কাছে।” যা শুনে অভিষেক ভক্ত নেতাদের কেউ কেউ মুচকি হেসে বললেন ” আজকের পর সব কথাই বাসি মনে হবে। ব্লকের তালিকা প্রকাশ হতে দিন।”