মুর্শিদাবাদে অধীরের পাশে বহরমপুরের মনোজ

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ ২০২১ সালে মণীন্দ্রনগর পঞ্চায়েতের সান্ধ্যকালীন সভায় বক্তব্য রাখতে উঠে সাংসদ অধীর চৌধুরী বলেছিলেন, “চেনা বামুনের পৈতা লাগে না। আমরা আপনাদের ঘরের রাখাল। আমাদের নিয়ে কোনও অসুবিধা নেই। তবে এলাকার মানুষ আমাদের ভালবাসেন তাই বলবো আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। আমরা আপনাদের বিভ্রান্ত করি না।”

রাজ্যের মানুষ তখন ধর্মীয় মেরুকরণের হাওয়ায় বিভ্রান্ত। কোন নৌকায় উঠবেন তাই নিয়ে দিশেহারা। সেই সময় তিনবারের বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তীকে জেতাতে অধীর এ ছাড়া আর কী বা বলতে পারতেন। ওই সভাতেই তৃণমূল ও বিজেপি প্রার্থীদের খোঁচা দিয়ে মনোজ বলেছিলেন “ আমার ছেলেটা যখন রাস্তায় হাঁটে তখন তাঁকে কেউ বলে না ওই চোর মনোজের ব্যাটা যাচ্ছে। এটুকুই আমার শান্তি এটুকুই আমার প্রাপ্তি। আপনাদের কাছ থেকে অধীর চৌধুরীর কাছ থেকে যা পেয়েছি তা যথেষ্ট পেয়েছি।”    

দীর্ঘ রোগভোগের পর গত মাসে মৃত্যু হয়েছে লালগোলার প্রাক্তন বিধায়ক আবু হেনার। দলে সময় দিতে পারেন নি, দলের ভেতরের হাজারও চাপে অধীর তবু তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেননি। নিয়তি নির্ধারিত সময়ে আবু হেনার প্রয়াণের পর তিনি ভেবেচিন্তে মনোজকে দিয়েছেন গুরুভার। মনোজ পেলেন বিশ্বস্তের পুরস্কার।

মনোজ চক্রবর্তীকে উত্তরীয় পরিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন অধীর চৌধুরী

অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন স্রোতে গা ভাসিয়ে দলপ্রিয় সংখ্যালঘু মুখ ও অধীর ঘনিষ্ঠ কাউকে দলের দায়িত্ব দিয়ে জেলা চালাবেন অধীর। যেমনভাবে নেতা বেছে নিয়েছেন কংগ্রেস বলা ভাল অধীর চৌধুরীর জোটসঙ্গী বামেরা। প্রথমে সিপিএম সংখ্যালঘু জেলায় জামির মোল্লাকে জেলার দায়িত্ব দিয়েছে। পরে আরএসপি একই পথে হেঁটে নওফেল মহাঃ সফিউল্লা ওরফে অ্যালবার্টকে অঞ্জনাভ দত্তের মৃত্যুর পর জেলা সম্পাদকের পদে বসিয়েছে।

কিন্তু সে পথে না হেঁটে যে ” মনোজকে খরিদ করা যায় না।” অধীর চৌধুরী এগিয়ে দিলেন সেই মনোজকে। ঘনিষ্ঠ মহলে রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরে থাকলেও জ্যোতি বসুকে রাজনৈতিক গুরু মানেন রাজ্যের প্রয়াত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ভাবশিষ্য মনোজ। বিধায়ক পদ চলে গেলেও নেতা হিসেবে শহরের আনাচে কানাচের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন প্রতিদিন। কটূবাক্য বলে ব্যক্তি আক্রমণ নয়, রাজনৈতিকভাবে যে কোনও ঘটনার মোকাবিলা করাই মনোজের বল ভরসা। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা গতি স্লথ করেছে কিন্তু নেতার মেজাজকে এতটুকু টলাতে পারেনি বয়স।

ঘনিষ্ঠ মহলে মনোজ ছোটদের পরামর্শ দেন “রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু হয় না।” নিজেও বিশ্বাস করেন। দলের বিরুদ্ধে নানান সময় দলেরই কেউ কেউ ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন হয় নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ হয়ে, না হয় দলের নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে। শুনেছেন, বুঝেছেন কিন্তু দলের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রকাশ্য বিরোধীতায় মদত দেননি মনোজ। ২০০৬ সালে অধীর চৌধুরীর ঘুটি হয়ে বিধায়ক পদে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন মায়ারানি পালের বিরুদ্ধে। পরে কংগ্রেসে নাম লিখিয়ে বিধায়ক হয়ে টানা তিনবার জিতে শেষবার হেরে গেলেন ধর্মীয় মেরুকরণের হাওয়ায় বিজেপি প্রার্থী সুব্রত মৈত্র ওরফে কাঞ্চনের কাছে। সাপে বরের মতো তাতে নেতার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বই কমেনি।

সভাপতি পদে বসে সদ্য প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক বামেদের সঙ্গে নির্বাচনী জোটের পক্ষেই সওয়াল করলেন। তৃণমূলের সঙ্গে জোটের গুঞ্জন উড়িয়ে বললেন ” রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বসে ভাত খেলাম আর জোট হয়ে গেল তা হয় না কি? রাহুল গান্ধীকে বসন্তের কোকিল বলা হয়েছিল সেটাও তো মনে রাখতে হবে। “

রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসক দল ভোট ময়দান নিজেদের দখলে রেখেছে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের কায়দায়। তারই ফাঁকে মহমেডানের মতো দলও জিতে যায়। জেলায় কংগ্রেসকে ঘুরে দাঁড়াতে হেরে যাওয়ার পরেও সামনের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য দল তৈরি করছেন অধীর চৌধুরী। ছায়াসঙ্গী হিসেবে থেকেছেন মনোজ। বহরমপুরের প্রাক্তন বিধায়ক এবার ‘পৈতে’ পেয়ে জুটি বাঁধলেন আর এক প্রাক্তনীর সঙ্গে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights