
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান পদ থেকে শেষপর্যন্ত ইস্তফাই দিয়ে দিলেন নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়। যাওয়ার বেলায় কংগ্রেস তথা বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরীকে খলনায়ক বানিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। বৃহস্পতিবার তাঁর পদত্যাগ পত্র নাড়ুগোপাল সদর মহকুমাশাসককে পাঠিয়েও দেওয়ায় শেষ হল বহরমপুর পুরসভায় তৃণমূলের মাত্র চার বছর তিন মাসের মেয়াদ।
চেয়ারম্যান হিসেবে স্বপ্ন পূরণ হলেও নীলরতন আঢ্যের রেকর্ড ভাঙতে পারলেন না নাড়ুগোপাল। বহরমপুর পুরসভার রেকর্ড বুকে লম্বা সময়ের পুরপ্রধান হিসেবে প্রথমেই থাকলেন প্রয়াত নীলরতন। একটানা আঠার বছর ছিলেন বহরমপুর পুরসভার পুরপ্রধান। কংগ্রেসের টিকিটে জিতে ৩৯ বছরের কাউন্সিলর। সেই নীলরতনের হাতে গড়া নাড়ুগোপাল প্রথমবার কাউন্সিলর হয়েছেন ২০২২ এ। সেবারই পুরপ্রধানের পদে বসেছিলেন। কিন্তু ‘কাকা’র রেকর্ড ভাঙা তো দূর, দুয়োরেও পৌঁছতে পারলেন না নাড়ুগোপাল। তার আগেই হাল ছাড়লেন কেন? তার উত্তর স্পষ্ট নয়। অভিজ্ঞরা বলছেন সময় বলবে।
তবে তাঁর এই পদত্যাগ আচমকাও নয়। বরং দেরীতেই হল। বঙ্গে পট পরিবর্তনের পর কেটে গিয়েছে প্রায় দেড় মাস। এই সময়কালে বহরমপুরে বুলডোজার চলেছে বিভিন্ন জায়গায়। নিন্দুকেরা বলেন, ” বেছে বেছে “। তবে বুলডোজার চলেছে তৃণমূলের আমলে গজিয়ে ওঠা অবৈধ নির্মাণে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, এই দর্শনে বিশ্বাস রাখলে তৃণমূলের আজকের দশা হতো না, বলছেন বহরমপুরের প্রবীণ নাগরিক সুশান্ত চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ” ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই শহর চলে গিয়েছিল দুষ্কৃতিদের হাতে। একের পর এক বাড়িতে ছলে বলে কৌশলে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত করের বোঝা। পরিষেবা বলতে কিছুই ছিল না। বলতে গেলেই জুটেছে অপমান। দেওয়ালেরও কান আছে এই আপ্তবাক্যে পুরসভার সমালোচনা করতেও ভয় লাগত।” বলেন, ” ভয় আউট, ভরসা ইনের জমানায় আজ এটুকু বলতেই পারি।”
এই ভয়ই কাল হয়েছে তৃণমূলের। মানুষের কাছে ভরসার বদলে আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন তৃণমূলের কাউন্সিলররা। কেউ কাউন্সিলর, অথচ তাঁর পেশা নির্মাণ সামগ্রী বিক্রি। তিনি একপ্রকার অঘোষিত শাহেনশা সেই এলাকার। কারও কোনও পেশা নেই অথচ তিনিও ত্রাস ওই এলাকার কাউন্সিলর পদ খাটিয়ে। বাসিন্দাদের দাবি, ” নিজের বাড়ির কাজ করাতে গেলেও পয়সা দিয়ে ম্যানেেরকরতে হত কাউন্সিলরকে। না হলে অন্য কাউকে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যে বদনাম দিয়ে পুলিশি হয়রানি করে জীবনের বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার মতো নোংরামী করতেও পিছপা হননি তাঁরা।” জিরে থেকে হিরে কেনার জন্য পুরসভার রেট ছিল আলাদা আলাদা। এরওপরে ছিল টোটো চালকদের কাছ থেকে অবৈধ টাকা তোলার মতো গুরুতর অভিযোগ। আর এসবই হয়েছে নাড়ুগোপালের প্রশ্রয়ে, রুদ্ধ হয়েছে পুরএলাকার উন্নয়নের গতি দাবি বহরমপুরের বাসিন্দাদের একাংশ।
২০২২ সালের ২৩ মার্চ পুরপ্রধানের পদে বসে নাড়ুগোপাল অভিযোগ করেছিলেন, “১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যে চাকরি দেওয়া হয়েছিল সেগুলি এখন পুরসভার বোঝা। মানুষের করের টাকায় তাদের বেতন দিতে হয়।” সেই সময় বহরমপুর পুরসভায় স্থায়ী কর্মী ছিলেন ৪৬৭ জন, দৈনিক মজুরীর সাতশো জন ধরে অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যাটা ছিল বারোশো জন। যেদিন তিনি পুরপ্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন সেদিন বহরমপুর পুরসভায় স্থায়ী কর্মী কমে হয়েছে ৩৪০ আর অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ২ হাজার ৬০০। কেউ কেউ বলছেন, “ওটা চার হাজারের বেশি”।
পুরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে পুর নির্বাচনের ঠিক আগে প্রায় চারশো জন অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ হয়েছিল তৃণমূলের তৎকালীন জেলা চেয়ারম্যান আবু তাহের খান ও সভাপতি শাওনি সিংহরায়ের recommendation এ। যদিও তাঁরা তা অস্বীকার করেছেন। সূত্রের আরও দাবি, অস্থায়ী কর্মীদের তালিকায় বেনামে রয়েছেন বহরমপুরে কর্মরত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের একাংশ কর্মী, স্থায়ী পুরকর্মীদের। কোনো কোনো সাংবাদিকের চার চাকার ইএমআই পরিশোধ হত পুরসভার তহবিল থেকে, এমন দাবিও উঠেছে পুরসভার অন্দরে। কিন্তু কেন? তার অবশ্য কোনও উত্তর মেলেনি। অভিজ্ঞরা বলছেন, ” তৃণমূল সংবাদমাধ্যমকে কিনে নিয়েছিল দুষ্কর্ম ঢাকতে। এটা তার প্রমাণ।”
আর এই অপকর্মের কালিতে মুখ পুড়েছে ব্যক্তি নাড়ুগোপালের। মুখ পুড়েছে পুরকর্মীদের ‘লড়াকু নেতা’ নাড়ুগোপালের। আর নীরবে তা সহ্য করতে হয়েছে তৃণমূল দলের সৌজন্যে বলছেন তাঁর একসময়ের সহযোদ্ধারা। তাঁরাই বলছেন, “বহরমপুর পুরসভার প্রতিটি ইঁট হাতের তালুর মতো চেনেন নাড়ুগোপাল। ওঁর মতো এত বুদ্ধি খাটিয়ে এই দুর্বৃত্তের সংসার চালানো অনেক বাঘের পক্ষেও কঠিন।” তাঁর আমলেই বহরমপুর ব্যারাকস্কোয়ার সেজেছে, তিন বেলা শহর পরিস্কার হয়েছে তাঁরই ইচ্ছেতে, দৈনিক বাড়ি বাড়ি ময়লা তোলা হচ্ছে কি না তা দেখভালের জন্য কর্মী নিয়োগ হয়েছে তাঁরই হাতে। শহরকে বিজনেস হাব বানাতে চেয়েছিলেন, সেই মতো শহর সাজানোর পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন বিধানসভা নির্বাচনের আগে। সেই কাজও শুরু হয়েছিল। কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী ছাড়া, সিপিএম, বিজেপির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক খারাপ ছিল না চেয়ারম্যানের।
তবে সে সব কিছু শুনতে নারাজ বহরমপুরের বিধায়ক সুব্রত মৈত্র। তিনি রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন (নগরায়ন) মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলের কাছে লিখিতভাবে বহরমপুর পুরসভার হিসেব নিকেশ খতিয়ে দেখার আর্জি জানিয়েছেন। আর তা তৃণমূলের জমানাই শুধু নয়। আর্জিতে জুড়ে দিয়েছেন কংগ্রেসের শেষ দশবছরের মেয়াদকাল। ঘটনাচক্রে তার একটা জমানায় তিনিও ছিলেন কংগ্রেসের প্রতীকে জেতা কাউন্সিলর। আর একটায় তৃণমূলের। বিজেপির বিধায়ক হয়ে সেদিনের ছেঁড়া পাতা ওল্টালেন কাঞ্চন, যেদিন তিনি আর্থিক দুর্নীতির প্রতিবাদে প্রথম সরব হয়েছিলেন পুরসভায়।