
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ গত পাঁচ মাসে এখনও বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠতে পারেনি বিজেপি। নরমে গরমে বাঙালির মন পেতে মরিয়া শুভেন্দু সরকার। আর কোনওরকম মেহনতি ছাড়াই বঙ্গ জীবনের আড্ডায় মুখরোচক হয়েছে এনসিপিআই বা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া। অথচ এনডিএ বা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের সঙ্গী এই দলের নাম দেশবাসীর মতো বঙ্গবাসীও প্রথম শোনে বাংলায় বিজেপি ক্ষমতা আসার পর। এই দলের রাজ্য নেতার নাম কি ? সেই প্রশ্নে ধাক্কা খেলেও দলটির লোকসভার নেতার নাম যে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তা আজ সবার জানা। সেই দলই মুর্শিদাবাদের জেলা সভাপতি হিসেবে শুক্রবার বিকেলে ঘোষণা করেছে সাংবাদিক রাজীব ঘোষের নাম। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এই পদে তাঁকে নিয়োগ করার ঘোষণা করেন। রাজীবের জন্ম রাজনৈতিক পরিবারেই। দাদু অশ্বিনী কুমার দে ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। মা ছায়া দে ঘোষ ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী। সেই দিক থেকে কবি-সম্পাদক, সাংবাদিক রাজীব রাজনীতিতে এলেন অনেক পরে।
তবে কংগ্রেস বিরোধী দল এনসিপিআইয়ের জেলা নেতার দায়িত্বে রাজীব যখন এলেন তখন তাঁর দলের তিন সাংসদ খলিলুর রহমান, আবু তাহের খান, ইউসুফ পাঠান রয়েছেন শ্যাম রাখি না কূল রাখির দোলাচলে। অথচ বাংলার রাজনীতিতে আগামী দিনে কলমের ‘নিব’ দাগ ফেলতে পারে তা আন্দাজ করেই জ্যোতিপ্রকাশরা নোঙর ফেলেছেন এখানে। আর তার শুরুটা করলেন মুর্শিদাবাদকে সামনে রেখেই। সংখ্যালঘু মুসলমান ভোটে জিতে আসা ওই তিন সাংসদের মনে যা চাপ বাড়াল। সূত্রের দাবি, মুর্শিদাবাদের তিনটি লোকসভাকে সামনে রেখে সংগঠন সাজানোর কৌশল নিয়েছে এনসিপিআই। রাজীবের কাঁধে এখন বহরমপুর লোকসভার ভার। লক্ষ্য ২০২৯। তার আগে স্থানীয় নির্বাচনে বিজেপি’র কক্ষপথই রাজীব তথা এনসিপিআইয়ের লক্ষ্যপথ তা বলার অবকাশ রাখে না।
কেন রাজ্যে শাখা ছড়াতে চাইছে এনসিপিআই ?
কেন্দ্রের এনডিএ জোটের বিরুদ্ধে সমানে লড়াই জারি রেখেছে ইন্ডিয়া জোটের অন্যতম দল কংগ্রেস। বাংলায় কংগ্রেস বিজেপি বিরোধী দল। সেই দলে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের পাশাপাশি মমতা কংগ্রেসও রাজ্যে বিজেপি বিরোধীতায় নাম লিখিয়েছে। ঋতব্রত পন্থী তৃণমূল বা গণতান্ত্রিক তৃণমূল দল বিধানসভায় স্বীকৃত বিরোধী দল হলেও তা যে বিজেপির ছায়ায় ছায়ায় চলে তা নিয়ে ধন্দ নেই জনমনে। এনডিএ-র শরিক হিসেবে যাঁরা আছেন কেন্দ্রে সে তেলেগু দেশম পার্টিই হোক কিংবা নীতিশ কুমারের দল, কি অজিত পাওয়ারের দল, কি রাম বিলাস পাসোয়ানের দল তাদের কারও বঙ্গে কোনও অঙ্গ নেই। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি তাঁর ছায়াসঙ্গীর সংখ্যা বাড়াতে চাইছে। আর তাই এনসিপিআই রাজ্যে শাখা খোলার সুযোগ পেয়েছে। ছ’মাস রাজ্য চালানোর পরে বিজেপি কি তবে আশঙ্কিত ভবিষ্যৎ নিয়ে? ভবিষ্যতে কি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে না শমীক ভট্টাচার্যের দল? এনসিপিআইয়ের বহরমপুর সংগঠনের নেতা বাছাইয়ের পর সেই প্রশ্নই সামনে আসছে।
তবে শুরুতেই দলের লক্ষ্যে মুর্শিদাবাদ কেন?
নিন্দুকেরা বলেন, সদ্য সমাপ্ত রেজিনগর উপনির্বাচনে বিজেপি মানুষের রায়ে ভয় পেয়েছে। পুলিশের সহযোগিতায় নির্বাচনে সুবিধা পেয়েছে রাজ্যের শাসকদল। কিন্তু সংখ্যালঘু অধ্যূষিত রেজিনগরের মানুষের মন জয় করতে পারেনি তারা। লড়াই করে কংগ্রেস দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। ফলে আগামীদিনে অবাধ নির্বাচন হলে বিজেপি ছাব্বিশের জেতা আসন ধরে রাখতে পারবে কি না তা নিয়েই ধন্দ রয়েছে দলে ও সংঘে। রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ছাড়া তেমন কোনও স্থানীয় দল ছিল না যাদের বিজেপি কাছে টানতে পারত। সেই তৃণমূল দল যে আজ তিন টুকরো বিজেপির টানেই, তা জানে নবীন কিশোরও। কিন্তু জোট বাড়াতে তা কম পড়বে। তাই এনসিপিআইকে জেলায় ঢুকিয়ে সংখ্যালঘু ভোটে জিতে আসা তিন সাংসদকে অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করলেন দলের নেতারা। যাঁরা সংখালঘু মুসলমানদের কথা চিন্তা করেই বেঁকে বসেছেন এনডিএ-র শরিক হতে। আগামী লোকসভা নির্বাচনে হয়ত দাঁড়াবেন না খলিলুর রহমান। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও ভাবতে নারাজ আবু তাহের খান। ইউসুফ পাঠান বহরমপুরে ফিরবেন কি না তা নিজেও জানেন না বলেই দাবি তাঁর বহরমপুর লোকসভার ঘনিষ্ঠদের। কিন্তু তার আগের আড়াই বছর বড় দামি বিজেপি ও এই সাংসদদের কাছে। রাজীব অবশ্য সে সব নিয়ে কোনও কথা বলছেন না। বললেন, ” মনে রাখবেন এনসিপিআই-ই বিজেপি’র পরে বৃহত্তম দল এনডিএ-তে।”