ঘুঘুর বাসা শিক্ষাভবন ! দেওয়াল জুড়ে পোস্টার লিখল কারা ?

Social Share

সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ মুর্শিদাবাদের শিক্ষা ভবন ঘুঘুর বাসা ! অর্থের বিনিময়ে এখানে হকের অধিকার পান শিক্ষক-শিক্ষিকারা ? এমনই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে তোলপাড় জেলার শিক্ষামহল। সম্প্রতি শিক্ষাভবনের দেওয়াল জুড়ে একাধিক পোস্টার পড়েছে। তার একটিতে লেখা হয়েছে ” হেথা আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন/ ডি আই অফিসে দালাল কেন? একি এলো দিন।” নিচে লেখা রয়েছে শিক্ষক ঐক্য মঞ্চ। আরও একটিতে লেখা রয়েছে ” মুর্শিদাবাদ শিক্ষা ভবনে কিছু অসাধু কুলাঙ্গার শিক্ষকের টাকা রোজগারের ফন্দি ফিকির থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন।”

মুর্শিদাবাদ জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের কার্যালয় শিক্ষা ভবন নামে পরিচিত। অভিযোগ, সেখানে একশ্রেণির অসাধু আধিকারিক, অসাধু শিক্ষক, ব্যক্তি সুবিধার্থে শিক্ষাভবনকে ব্যবহার করছেন, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। সম্প্রতি ধুলিয়ান হাই মাদ্রাসার ঘটনাতেও শিক্ষা ভবন জড়িয়ে থাকতে পারে বলে অনেকের মত। ওই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক দুর্নীতিতে যুক্ত এই অভিযোগ তুলে গত বুধবার প্রায় ঘণ্টা তিনেক তাঁকে তালাবন্দি করে রাখেন গ্রামবাসীরা।

ফরাক্কা ব্লকের বহু বছরের পুরনো ওই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ওই পদে থাকতে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের জন্য কখনও তাঁর ঊর্ধতন কতৃপক্ষকে জানান নি, বলে ওইদিন গ্রামবাসীরা দাবি করেন। একইসঙ্গে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুলে ভুয়ো শিক্ষক নিয়োগেরও অভিযোগ তোলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের সুরে সুর মিলিয়েছিলেন স্কুলের সহকারি শিক্ষকদেরও একাংশ।

বছর দুয়েক আগে মুর্শিদাবাদের গোঠা হাইস্কুলে ভুয়ো শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগে রাজ্য গোয়েন্দা বাহিনী প্রাক্তন জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক পূরবী দে বিশ্বাস সহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। তাঁদের জেল ও হয়। শিক্ষা ভবনের করণিক তথা তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি নিত্যগোপাল মাঝি ও প্রাক্তন করণিক অঞ্জনা মজুমদার ধৃতদের তালিকায় ছিলেন। বেআইনি নিয়োগে এদের কারও গাফিলতি, কারও যোগ পাওয়া গিয়েছে বলে সেই সময় দাবি করেছিলেন গোয়েন্দা বাহিনীর কর্তারা।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে পূরবী দে বিশ্বাস অবসর গ্রহণ করলে তাঁর জায়গায় দায়িত্ব নেন অমর কুমার শীল। পাঁচ বছরের বেশি সময় তিনি জেলায় রয়েছেন। অভিযোগ, শিক্ষাভবনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পেনসন জনিত কাজকর্মেও অসাধু চক্রের যোগ রয়েছে। সেখানেও একাংশ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে কালোকে সাদা করে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থতা জনিত কারণে অতিরিক্ত ছুটি নেওয়ার পরেও তার সমন্বয় করা হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। যদিও এব্যাপারে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শককে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ” পেনসনের কাজ আমি নিজেই করি। এই ধরনের কথার কোনও ভিত্তি নেই। অভিযোগ করলে হবে না, প্রমাণ নিয়ে আসতে হবে।”

শিক্ষা ভবনের দেওয়ালে যাঁরা এই ধরনের পোস্টার লাগিয়েছেন তাঁরা শিক্ষাভবনের গায়ে কালি মাখাতেই যে এই কাজ করেছেন পাল্টা সেই দাবিও উঠছে। যে মঞ্চের নাম করে নানান ধরনের পোস্টার পড়েছে শিক্ষা ভবনের দেওয়ালে সেই মঞ্চের কোনও খোঁজ মেলেনি। তৃণমূল আশ্রিত মাধ্যমিক শিক্ষা সেলের জেলা সভাপতি সুদীপ সিনহা রায় বলেন, ” এই ধরনের কোনও সংগঠনের নাম আগে শুনিনি।” তবে কিছু অনৈতিক ঘটনা যে ঘটছে তাও অস্বীকার করেন নি তিনি।

কটাক্ষ করে সুদীপ বলেন, ” নিশ্চয় এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। না হলে কেউ খামোকা লিখতে যাবে কেন? হয়ত নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারায় সমস্যা হয়েছে তাই নিজেরাই আর এক পক্ষের গায়ে দোষ চাপাতে এই ধরনের লেখা দেওয়ালে লিখে গিয়েছে।” শিক্ষাভবন যে ঘুঘুর বাসা হয়ে উঠছে তাও তিনি স্বীকার করেন। তৃণমূলের এই শিক্ষক নেতা বলেন, ” এক শ্রেণির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এখানে কিসের জন্য ঘোরাঘুরি করবেন ? এই কার্যালয় আগে ঘুঘুর বাসা ছিল না। ইদানিং আমরাও তা প্রত্যক্ষ করছি। শুনছি অর্থের বিনিময়ে পেনশনের কাজকর্ম করা হয়। কিন্তু হাতেনাতে সেই ঘুঘু ধরা পড়ছে না।” তবে এই ধরনের অনৈতিক কাজে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক যুক্ত কি না সেই প্রশ্নেও সুদীপের কৌশলী উত্তর, ” সেটা বলতে পারব না। তবে আমরা তদন্ত করে না দেখে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।”

নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির জেলা সম্পাদক গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ও একইরকম অভিযোগ পেয়েছেন কিন্তু প্রমাণ পাননি। তিনি বলেন, ” শিক্ষা ভবনের এই দূরবস্থা আগে সত্যিই ছিল না। এখন এগুলো বর্তমান শাসকের কল্যাণে একপ্রকার নিয়মে পরিণত হয়েছে।” শিক্ষভবনের পুরনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তৃণমূল শিক্ষা সেল।

শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের পাল্টা দাবিও সামনে আসছে। শিক্ষাভবনে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে শাসকদলের বর্তমান বা প্রাক্তন অসাধু শিক্ষক নেতাদের হুমকিতেও অনৈতিক কাজে হাতে খড়ি হয় অনেক আধিকারিকের যা পরে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights