শহরের হেঁসেলের গন্ধ নিতে রেঁস্তোরায় ইউসুফ

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ কলকাতার আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে বিনি সুতোয় নিজেদের গেঁথে নিয়েছেন রাজ্যের প্রতিটি কোণের মানুষ। প্রবল দুর্যোগ উপেক্ষা করে শনিবার কাক ভেজা ভিজেছেন বঙ্গবাসী। শুধুমাত্র নিহত কন্যার বিচারের দাবি নিয়ে রাতের রাস্তায় মিছিল করেছেন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ। আঙুল তুলেছেন শাসকের দিকে। সেই স্বর উপেক্ষা করতে পারেনি তৃণমূল। গত একমাসে নাগরিক সমাজের ক্লান্তিহীন প্রতিবাদে টাল খেয়েছে শাসকদলের ঔদ্ধত্য। পিছু হঠেছে ক্ষমতার আস্ফালন। আর সেই সুযোগে মানুষের মনে জমে থাকা ধিকিধিকি ক্ষোভ প্রশমনের উপায় খুঁজতে, নতুন পথের হদিশ পেতে, পথকেই বেছে নিয়েছে ঘাসফুল শিবির। প্রতিটি শব্দের ময়নাতদন্তেও রাজি নেতারা। টুকটাক মেরামতিতে কর্মক্ষম না হলে চাইছেন দলের খোলনলচে বদলে ফেলতে। আর সেই লক্ষ্যে ভাদ্র মাসেই শুরু হয়েছে ঘর ঝাড়া-মোছার তোড়জোড়। বহরমপুরে সেই কাজে হাত মিলিয়েছেন নয়া সাংসদ ইউসুফ পাঠান।

তিনি কি মেহমান? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বলতে কখনও ইতস্তত করেননি তিনি। উল্টে ঘরের ছেলে হয়ে মানুষকে তার পরিষেবা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন বারবার। হয়ে উঠতে চাইছেন পাশের বাড়ির ছেলে। কিন্তু বহরমপুর সেক্ষেত্রে যে বড় দুর্জয় ঘাঁটি, সে সংবাদ তিনি সযত্নে রেখেছেন কুর্তার পকেটে। আরএসপি’র অস্তাচলে যাওয়া ইস্তক বহরমপুর বিরোধী শিবিরের বাসিন্দা। তৃণমূল জমানাতেও তার চরিত্র বদলায়নি। ইউসুফ অন্যত্র জিতলেও বহরমপুরে হেরেছেন কংগ্রেসের কাছে। অথচ বহরমপুরের বিত্তবান মানুষজনের একাংশের সঙ্গে শাসকদলের নেতা নেত্রীদের ওঠাবসা চোখ টাটায়। তবু কেন ঘাসফুলের দিক থেকে মুখ ফেরান তাঁরা? সেই সমীক্ষা করতেই পথে নেমেছেন ইউসুফ, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ইঙ্গিতে।

শনিবার দুপুরে ইন্দ্রপ্রস্থের মতো অভিজাত এলাকায় ততোধিক অভিজাত একটি রেঁস্তরায় ঢুঁ মেরেছিলেন সাংসদ। সঙ্গী ছিলেন পুরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল। হাতের কাছে সাংসদকে পেয়ে প্রাথমিক আপ্যায়ন সেরে অতিথিদের সঙ্গে নানান বিষয়ে আলোচনা করেছেন ‘তৃণমূল বিরোধী’ অধ্যাপক-ব্যবসায়ী শৈবাল রায়। সাংসদের সঙ্গে মত দেওয়া নেওয়া করেছেন নানান পরিকল্পনা নিয়ে। অবাক হয়েছেন সাংসদের সহজাত ভদ্রতায়। সে সব নিজের ফেসবুকের পাতায় ফলাও করে লিখেওছেন তিনি।

কিন্তু হঠাৎ সার্কিট হাউজ ছেড়ে ইউসুফ একটি রেঁস্তরায় কেন? কারণ নিয়ে কোনও ধোঁয়াশা নেই। তিনি পরখ করতে চাইছেন সরকারি সব সুবিধা পেয়ে, প্রয়োজনে নেতাদের সাহায্য নিয়েও মানুষ কেন বিরোধী শিবিরের ব্যলট বক্সের দিকেই ঝুঁকে পড়েন নির্বাচনকালে। কেন তাঁদের জোর খাটাতে হয় দলে টানতে। এরআগে শুভেন্দু অধিকারী, মুকুল রায়ের মতো তৃণমূল নেতারা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লোকসভার একজন সদস্য হিসেবে মানুষের দোরে কড়া নাড়বার মতো সুযোগ কখনও পায়নি তৃণমূল। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ভারতের জাতীয় দলের প্রাক্তন এই ক্রিকেটার। মাটন, ভেজিটেবল, আইসক্রিম, সাদা ঘি, গুজরাটি কিছু ভেজ আর ডাল সহযোগে পরিমিত আহারের মাঝেও মেলানোর চেষ্টা করেছেন মানুষ হেলে কোনদিকে। শহরের এখানে ওখানে ঘুরে এ কদিনে তিনি টের পেয়েছেন, ভূমিপুত্র নাড়ুগোপালের সঙ্গে শহরের মানুষের নাড়ির যোগ। ঘরোয়া আসরে জানতে চেয়েছেন “তবু ভোটে টান পড়ে কেন?”

আরজিকর কান্ডের হেঁচকা টানে হঠাৎই বেসামাল তৃণমূল। প্রতি পলে চলছে ত্রুটি বিচ্যূতির কাঁটা ছেঁড়া। শহরের মানুষের একটা বড় অংশ তৃণমূল বিরোধিতা প্রকাশ্যে এনেছেন। এমন সময় গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে রেখেছে তৃণমূল। কিন্তু এই প্রতিবাদ যদি স্থায়ী হয়। যদি সংক্রামিত হয়ে ছড়িয়ে পরে গ্রাম বাংলার চরে? তবে বিপদ। তার আগে ফের মলাট বদলে মানুষের মন বদলানোর মরিয়া চেষ্টা করতে কসুর করবে না জোড়াফুল শিবির। মুখে বলা সহজ, কিন্তু কাজে করা কঠিন মেনেও বিরোধীরা অবশ্য তোপ দেগেছেন এই বলে “২৬-এই খেলা শেষ।” নিরুত্তর তৃণমূল অবশ্য দলের এই ক্রান্তিকালে নিচ্ছে সংযমের পাঠ।

আরও পড়ুনঃ জেলাপরিষদের তৃণমূল সদস্যার ছেলেকে গ্রেফতার করল পুলিশ

One thought on “শহরের হেঁসেলের গন্ধ নিতে রেঁস্তোরায় ইউসুফ

  1. লেখাটা শনিবারের সাপ্লিমেন্টের পাতায় রেস্টুরেন্টের রিভিউয়ের টোনে সিরিয়াস রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। ভালো লাগলো পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights