
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ চলতি বছর দুর্গা পুজোর শুরুটা দীর্ঘদিন মনে থাকবে বহরমপুরবাসীর কাছে। মাসভর পেশার চাপে পিষ্ঠ মানুষ হালকা মেজাজে সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান উপভোগ করতে চেয়েছিলেন চতুর্থীর সন্ধ্যায়। কিন্তু তা হল অনেক হয়রানি শেষে। একাংশ শুধু হয়রান-ই হলেন, আগমনীর সুরের বদলে মঞ্চ পর্যন্ত যেতে গিয়ে তাঁদের অধিকাংশের মেজাজ গেল বিগড়ে। ভাগ্যকে দুষেও আঙুল তুললেন প্রশাসনের বিশেষ করে পুলিশের দিকে।
পশ্চিমবঙ্গে চালকের আসনে বসে রাজ্যবাসীকে ভরসা দিয়েছে বিজেপি সরকার। প্রতি মুহুর্তে বিগত সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যই যেন বেদবাক্য, তাঁর সমর্থক, অনুগামীদের কাছে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে প্রতি পদে হোঁচট খাচ্ছেন তাঁর সেনাপতিরা। আর হয়রানি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। সর্বত্রই অপেশাদারিত্বের ছাপ। চতুর্থীর সন্ধ্যায় সেই ছাপ স্পষ্ট ছিল বহরমপুরেও।
আনুমানিক পাঁচ কোটি টাকা ব্যায়ে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর দু’দিনের একটি আগমনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সূত্রের দাবি, সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে আলো, বাহারি স্টল থেকে দর্শকদের বসার আসন সবই সাজানো হয়েছিল গুজরাটের ডেকরেটর গোব্যানানার ছক মতো। কলকাতার মনোময় ভট্টাচার্যকে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জুড়ে দিলেও অনুষ্ঠানের তার বাঁধা ছিল উত্তরাখন্ডের পবনদীপ রাজনের কাঁধে। এই ইন্ডিয়ান আইডলই এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভয়েস অব ইন্ডিয়া। তাঁর লাইভ শো ছিল চতুর্থীর সন্ধ্যায়। মুক্তমঞ্চে যেখানে অবাধ প্রবেশ তেমন সরকারি অনুষ্ঠান বহরমপুরবাসী দেখেনি এর আগে। তার সঙ্গে পুজোর আবহ মিশে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে দূর দূরান্ত থেকে জনস্রোত এসে মিশেছে শহরে।
প্রথম দিনের ভিড়কে টপকে গিয়েছে দ্বিতীয় দিন। আর সেই স্রোত সামলাতে গিয়ে হিমসিম খেয়েছে পুলিশ। বারাক স্কোয়ারের চারদিকেই যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। কিন্তু ঢোকা বেড়নোর রাস্তার সীমা টানতে গিয়ে পুলিশই আটকে গিয়েছে নিজের জালে। সেই দাবি তুলে লালবাগের রক্তিম দাস বলেন, ” পুলিশ ক্যামেরা নিয়ে ফটো তুলে কেস দিতে হাত পাকিয়েছে। কিন্তু কিভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের যাতায়াত সহজ করা যায় তা গিয়েছে ভুলে।” তবে এই অসুবিধা, এই হয়রানকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না প্রশাসনের কর্তারা। বরং এত বড় সরকারি অনুষ্ঠান উতরে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন কেউ কেউ। কেউ বলছেন, ” এটা মেগা ইভেন্ট ভুলে গেলে চলবে না। প্রবেশ ছিল অবাধ। ভিড় হবেই এটাই স্বাভাবিক। এখানকার রাস্তাও তো আর বিরাট চওড়া নয়। স্বাভাবিকভাবেই যান চলাচলে জট পেকেছিল। তবে তা বেশিক্ষণ ছিল কি?”
সূচি ভুলেছিল মঞ্চও। বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটার মধ্যে যে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কথা ছিল তা গড়িয়ে গিয়েছে রাত বারোটা কুড়িতে। ততক্ষণে ভিড় পাতলা হয়েছে। কিন্তু মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেন্সে যে ড্রোন শো দেখেছেন বঙ্গবাসী, সেই ড্রোন শো-বহরমপুরেও হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাত বারোটা পনেরোতে ঘোষক যখন উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে চমক দেওয়ার কথা ঘোষণা করছেন, মানুষের বুকে তখন সেই ড্রোন শো-র প্রত্যাশা। কিন্তু নাহ। কয়েকটি আতস বাজি ফাটিয়েই এবারের মতো সাঙ্গ হল আগমনীর গান। ভারপ্রাপ্ত জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক সুবীর সরকার বলছেন, ” দু’জন বড় বড় পেশাদার শিল্পীর লাইভ অনুষ্ঠান, একটু দেরি হয়েছে ঠিকই। তবে জেলাশাসকের অনুমতি নিয়েই একটু বেশি রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান হয়েছে।” তবে ড্রোন শো বহরমপুরে হওয়ার নাকি কথাই ছিল না বলে দাবি করছেন জেলা তথ্য ও সাংস্কৃতিক আধিকারিক। তিনি বলছেন, ” ওটা প্রথমে ভুল করে লেখা হয়েছিল। পরে তা মুছেও দেওয়া হয়েছে।”
সব মিলিয়ে হাজার পাঁচেক লোকের বসার আয়োজন ছিল। কিন্তু ভিড় হয়েছে তার তিন গুণ। সে কথা নিজেই জানালেন ভারপ্রাপ্ত জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক। আর সেই ভিড়েই বসার চেয়ার ভাঙচুর হয়েছে। মানুষ অধৈর্য্য হয়েছে। বসতে না পেরে, আশা পূরণ না হওয়ায় রাত দশটা বাজার আগেই মাঠ ছেড়েছেন বহু মানুষ।
প্রশাসন কিন্তু পাশে পাচ্ছেন তাঁদের, যাঁরা শেষ ঘোষণা হওয়া পর্যন্ত মাঠ ছাড়েননি সেই সব দর্শকদের। প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন মাঠে যাঁরা বিনা পয়সায় স্টল পেয়েছিলেন। তাঁদের প্রায় সকলেরই একসুর। বলছেন, ” বিক্রিবাটা ভালোই হয়েছে।” শহরের এক প্রসিদ্ধ মিষ্টি ব্যবসায়ী সুদীপ্ত সাহা বলছেন, ” প্রথমবার এত বড় অনুষ্ঠান। একটু ত্রুটি তো থাকবেই। কিন্তু আবর্জনা পরিস্কার থেকে শৌচালয় সব ব্যবস্থাই ভাল ছিল। মানুষও ভিড় করে এসেছিলেন আমাদের স্টলে। বিক্রি ভাল হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞ।”