জেন জি-কে স্ব-সময়ে ফেরাল অযোধ্যানগরের জেন ওয়াই

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ জেন জি, জেন ওয়াই আর বেবি বুমার্স। এই তিন মাথার মোড় ২০২৬। বিনোদন থেকে বিপ্লব, তিন প্রজন্মের তিন রকম কায়দা। পুজোই বা বাদ যায় কিসে ? বয়সের ফারাকে কনিষ্ঠ জেন জি। স্বাধীনচেতা এই প্রজন্ম ব্যক্তি সচেতনতায় ভরপুর। ইন্টারনেট, অ্যান্ড্রয়েড কিংবা আইওএস আর সোশ্যাল মিডিয়ার জালে যারা আটকে, যাঁদের দাবি জারা হাটকে জারা বচকে। এই প্রজন্ম দিল্লির যন্তরমন্তর কাঁপিয়ে দিলেও পুজোর দায়িত্বে সেভাবে আসেনি। পুজো এখনও সামলে চলেছেন জেন ওয়াই আর বেবি বুমার্সের একাংশ।

জেন ওয়াই দেখেছে একটি প্রজন্ম থেকে আর একটি প্রজন্মের পরিবর্তন। বাবা-মায়ের হাত ধরে পুজোর কেনাকাটা করতে করতে কখন এরা অনলাইনে কেনাকাটায় সিদ্ধহস্ত হয়ে গিয়েছে টের যখন পেল তখন জেন ওয়াই চাইছে কুইক ডেলিভারী। আকাশটারও হাত বদল হয়ে গিয়েছে। অথচ বেবি বুমার্সদের এরাই শেখাতে পেরেছিলেন পরিবর্তনই জীবনের অঙ্গ। সেই তারাই এখন জেন ওয়াইকে বোঝাতে অক্ষম বঙ্গ জীবনের অঙ্গ বোরোলিন। বোঝাতে পারছেন না ওঠা পড়ার নামই জীবন। বোঝাতে পারছেন না ধৈর্য্যই প্রেম। বিবাহ মানে বন্ধন। আর সেসব দেখে মুচকি হাসছেন বেবি বুমার্স। আর সেখান থেকেই ” আমাদের কালই ভাল ছিল।” সেখানেই ফিরে যেতে চায় চল্লিশ। দেখতে চায় বহুতল সংস্কৃতির বাইরে পাড়ার কালচারে ছিল নাড়ির টান। ছিল চাওয়া আর পাওয়ার মাঝখানে একটা লম্বা অপেক্ষা। পাশের বাড়ির মানুষগুলোই হয়ে গিয়েছিল আত্মীয়। ছিল সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরের মতো একটা উত্তমকুমারীয় হাবভাব। জেন ওয়াইয়ের যে গল্পে অনিহা।

এই জেন ওয়াইের হাত ধরেই পুজোর মন্ডপ থেকে প্রতিমা সজ্জায় এসেছে থিমের ভাবনা। সেই থিমের হাত ধরেই দেশের নানা মন্দির থেকে স্থপতি তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে মানস ভ্রমণ শিখিয়েছ ১৯৮১তে জন্ম নেওয়া মানুষজনই। তাঁদের মধ্যেই আজ ফিরে দেখবার প্রবল চাহিদা। সেই চাহিদার নিজেদের মন্ডপে একঝলক তুলে এনেছে অযোধ্যানগর দুর্গা পুজা কমিটি। এই পাড়ায় একশো পরিবারের বাস। সেই পাড়ার কথা ভেবেই থিমের নামকরণ হয়েছে শ পরিবার। প্রবেশ পথে ঢুকেই আসল নকলের ধন্দে পড়বেন দর্শনার্থীরা। দুর্গা মন্ডপের সামনে শিব মন্দির আর এই দুই মন্দিরকে ঘিরেই পাড়া।

গায়ে গায়ে লাগা বাড়ি। বাড়িগুলো দো-তলা। নিচের তলায় কারও দোকান। কেউ বা ভাড়া দিয়েছে কাউকে। ছেলেরা আড্ডা দিচ্ছে কারও বাড়ির দালানে। আধুনিক লিফট বা এলিভেটরের বদলে আলকাতরা মাখানো কাঠের সিঁড়ি। বাড়ির জলের ট্যাঙ্কও নিঁখুতভাবে তুলে আনা হয়েছে। ছাদে কাপড় মেলছেন কেউ। পুজো চলছে। যতটা সম্ভব একচিলতে ৯০’স তুলে আনার চেষ্টা করে সরকারের দেওয়া সেরা পুজোর পুরস্কার জিতে নিয়েছে অযোধ্যানগর। আর সব করা হয়েছে পরিবেশ বান্ধব উপকরণ দিয়েই। আর এইসব করেছেন আর্ট কলেজের ছেলে রৌনক মুখোপাধ্যায়। কিন্তু হঠাৎ এই ভাবনা কেন? পুজো কমিটির সম্পাদক গোপাল সাহার দাবি, ” এখনকার পুজোর থেকে আগের পুজোর আনন্দ বেশি ছিল। এই কথা পাড়াতেও বছরভর আলোচনা হত। সেই সব দিনে ফেরা তো সম্ভব নয়। তাই পুজো মন্ডপের থিম হিসেবে সেই পাড়াকেই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।” আজকের মতো থ্রি ডি না হলেও নব্বই দশকের শুরুতে প্লাইবোর্ডকে কাজে লাগিয়ে অনেক চিত্রশিল্পী ‘সিনারি’ ফুটিয়ে তুলতেন মন্ডপে মন্ডপে।

তবে আগেকার দিনে বাড়ির দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার সাঁটানো হত কি হত না তা নিয়ে তর্ক থাকলেও দোকানের গায়ে বা অন্যকোথাও বিজ্ঞাপণ বা সিনেমার পোস্টার সাঁটানো হত। সেটা এখনও হয়। কিন্তু চ্যাট জিপিটির সাহায্যে যে পোস্টার মন্ডপের থিমে ব্যবহার করা হয়েছে তা দৃষ্টিনন্দন মোটেও নয়। আরও ধৈর্য্যের দরকার ছিল। আরও নিঁখুত হতে পারত। পুজোয় কি সবাই দরজা জানলা বন্ধ করেই পুজোর আনন্দ উপভোগ করতেন? জানলা খোলা রাখা যেমন যেতে পারত, তেমনি মন্দিরের সামনেটাতেও ঘাসের ছোঁয়া আনা যেত সহজেই। প্রায় ছ’ কাঠা জায়গার ওপর এই মন্দির নির্মাণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন পুজো কমিটির সম্পাদক। কিন্তু এতটা জায়গাকে আরও ভালভাবে কাজে লাগালে আরও নতুন কিছু সংযোজিত হলে আরও নিঁখুত, আরও জীবন্ত করা যেত বলে দাবি জেন জি’র। যা বারবার জেন ওয়াইকে হারিয়ে দিয়েছে জেন জি।

সেটা মেনে নিচ্ছেন এই পুজো কমিটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শৈবাল রায়। ২০১৮ সালে তিনি এখানে রামমন্দিরের আদলে পুজো মন্ডপ তৈরি করেছিলেন। তিনি এখন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ” ” আমরা যখন থিম ফাইনাল করি তখন কোন বিশেষ বার্তা দিতে চাওয়াটাই একমাত্র বিচার্য থাকে না। উদ্যোক্তাদের নিজেদের একটা চ্যালেঞ্জ থাকে পুরোনো ফর্ম ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার। প্রতিষ্ঠিত ধারা, যেটা সাফল্য এনে দিয়েছে বিগত দিনে সেই চেনা রাস্তায় হেঁটে আবার সাফল্য নিশ্চিত করতে চান অনেকেই। আবার কখনো কখনো পুরো ছক উল্টে দেওয়ার আনন্দে ধরা দেওয়া যায়। এবছর আমাদের অযোধ্যানগর এই দ্বিতীয় পথে গেছে। কাজ অবশ্যই আরো নিখুঁত হতে পারতো। তবে যে শিল্পী করেছেন তিনি নবীন ও কমিটির বাজেটের চাপও তাঁকে সামলাতে হয়েছে। আমি থিম অ্যাপ্রুভ করা ছাড়া মাথা গলাই নি এতটুকু। সবটুকু রৌনকের কৃতিত্ব। প্রথম বছরেই এই সাফল্য। নিশ্চিত শিল্পীকে উৎসাহিত করবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights