
বিদ্যুৎ মৈত্র, মুর্শিদাবাদঃ অপেক্ষার অবসান। অবশেষে স্বপ্ন পূরণ। নশিপুর রেল সেতু দিয়ে মহালয়ার দিন গড়াল যাত্রীবাহি রেলের চাকা। উৎসবের গুমোট আবহে জেলায় বইল খুশির হাওয়া। উৎসাহী জেলাবাসী নয়া ট্রেনের সঙ্গে ব্যস্ত হলেন সেলফি তুলতে। সেই ট্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেশন ছাড়তেই সমাজমাধ্যম জুড়ে সেই ছবির ঠেলাঠেলিতে বিশ্ব জানল শিলান্যাসের প্রায় বছর ২০ পরে নড়ল নশিপুর রেলসেতু। আর তা নিয়ে দিনভর সেখানেই চলল কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপি’র কৃতিত্ব নিয়ে টানাটানি।
আজিমগঞ্জে তৃণমূল সাংসদ আবু তাহের খান ও বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ তর্ক ছেড়ে সবুজ পতাকা নেড়ে আজিমগঞ্জ-কাশিমবাজার ট্রেনের যাত্রা সূচনা করেন। অন্যদিকে কৃষ্ণনগর স্টেশনে বিজেপির বহরমপুরের বিধায়ক সুব্রত মৈত্র, রানাঘাট উত্তর পশ্চিমের বিধায়ক পার্থ সারথী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে সূচনা করেন কৃষ্ণনগর- আজিমগঞ্জ ট্রেনের। আর এই হুল্লোড়ে আড়ালেই থেকে গেল ইতিহাস। উপেক্ষিত হলেন উদ্যোক্তারা। আক্ষেপ এলাকাবাসীর।

চলতি বছর একেবারে লোকসভা নির্বাচনের মুখে কৃষ্ণনগর থেকে ভার্চুয়ালী নশিপুর রেলসেতুর উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ২০০৪ সালে এই রেলসেতু তৈরির শিলান্যাস করেছিলেন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। ৪৬ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্দও হয়েছিল সেই সময়। কথা ছিল ২০১০ সালে এই রেলসেতুর কাজ সম্পন্ন হবে। কাজও শুরু হয়েছিল। ৭৫৮ মিটার দীর্ঘ ওই রেল সেতু নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেও জমি জটে থমকে গিয়েছিল সেতুর ভবিষ্যৎ। বাকি থাকা এক শতাংশ কাজ মিটতে লেগেছে দীর্ঘ চোদ্দ বছর। এক্ষেত্রে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিঞ্চিত ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না, বলছেন এলাকার মানুষজনও। তিনি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন পরে জমি জট কাটাতেও তাঁর ভূমিকাই ছিল মুখ্য, দাবি সূত্রের।

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্মদিনে যখন সেই সেতু দিয়ে রেলের চাকা গড়ায় তখন তা নিয়ে আহ্লাদের শেষ যে থাকে না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই সেতুর কথা মাথায় এসেছিল কার? কারা চিন্তা করেছিলেন মধ্যবঙ্গের এই সেতু সহ দু’ কিলোমিটার মত রেলপথ দিয়ে রেল গড়ালে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সহজ হবে যোগাযোগ। উন্নতি হবে পিছিয়ে পড়া তকমা লাগা মুর্শিদাবাদ জেলার ব্যবসার। তাঁদের নামটুকুও এদিন শোনা যায়নি জনপ্রতিনিধিদের ভাষণে।

প্রয়াত সাংবাদিক শান্তনু ঠাকুর ‘ভারতকথা’ সংবাদপত্রে ১৯৮৯ সালে এই নশিপুর সেতু নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। “শিয়ালদা-লালগোলা সেকশনের দু কিমি রাস্তার পুনঃপ্রবর্তন করলে উঃভারত, দঃভারতের যোগাযোগ স্থাপিত হবে” এই শিরোনামে (অপরিবর্তিত) লেখা হয়েছিল সেই সংবাদ। ওই সংবাদ সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে এই রেলপথ চালু ছিল। অবিভক্ত ভারতের বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মেঘালয় ও অসমে হাজার হাজার টন কয়লা সরবরাহ হত এই পথ দিয়ে। স্বাধীনতার পর কোনও অজ্ঞাত কারণে রেলপথটি বন্ধ হয়ে যায়। তার সাক্ষী ভাগীরথীর বুকে আজও দাঁড়িয়ে থাকা সেতুর দুই স্তম্ভ। সেদিক থেকে স্বাধীনতার ৭৭ বছর পর সেই সেতু দিয়ে রেল গড়াল ২০২৪ সালে।
জেলার ইতিহাস খুঁড়ে জানা গেল, ১৯৮০ সালে গণকন্ঠ পত্রিকার পক্ষ থেকে এই বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে রেলমন্ত্রী কমলাপতি ত্রিপাঠীকে প্রথম একটি চিঠি লেখা হয়েছিল। সেদিনও দাবি ছিল দু’কিলোমিটার রেলপথ সহ সেতু নির্মাণের। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ কমলাপতি ত্রিপাঠী থেকে অশ্বিনী বৈষ্ণব কতবার কতজন রেলমন্ত্রী বদলাতে দেখেছেন জেলাবাসী। ছায়া ঘোষ থেকে প্রমথেশ মুখোপাধ্যায়, অধীর চৌধুরী হয়ে হাল আমলের গৌরী শঙ্কর ঘোষ, সুব্রত মৈত্র, আবু তাহের খানদের মতো জন প্রতিনিধিদের একই দাবিতে পাঠানো চিঠি মেইলের ইনবক্স আর ফাইলেই বন্দি থেকেছে রেল মন্ত্রালয়ে। মাঝখানে রেলের প্রতিমন্ত্রী হয়ে অধীর চৌধুরীও টলাতে পারেননি জমি জটে আটকে থাকা সেতু।
গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত প্রাণরঞ্জন চৌধুরী, প্রতিভারঞ্জন মৈত্র, অপর্ণাপতি ভট্টাচার্য, চিত্তরঞ্জন মজুমদার, শান্তনু ঠাকুর, জেলা ব্যবসায়ী সমিতির বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য পরবর্তী সময়ে প্রয়াত এ.আর.খানের মতো মানুষজনও একই দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বারবার। তারমধ্যে ২০০৪ সালে এই রেলসেতু তৈরির শিলান্যাস করে জেলাবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। তারপরেও কেটে গেল কুড়িটা বছর। অবশেষে নরেন্দ্র মোদীর জমানায় অশ্বিনী বৈষ্ণবের হাতে সূচনা হল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের। তার ফলে কাশিমবাজার স্টেশনের গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। সপ্তাহে চার জোড়া ট্রেন চলবে এই সেতু দিয়ে। শুক্রবার তার সূচনা। স্বপন বলেন, ” জীবদ্দশায় এই সেতু দিয়ে যে ট্রেন চলবে তা ভাবিনি। আজ স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় ভাল লাগছে। মনে পড়ছে পুরনো সেই দিনগুলোর কথা। কত গুণীজন এই একটি সেতুর জন্য সোচ্চার হয়েছিলেন। আজ তাঁরা কেউ বেঁচে নেই। আশা করা যায় জেলার ব্যবসা, পর্যটনেও উন্নতি হবে এবার।”
তবে নতুন ট্রেন চলার কথা উঠতেই প্রবীণ বহরমপুরবাসীর মনে পড়ল ১৯৮৩ সালের কথা। ইন্দ্রপ্রস্থের বাসিন্দা ৭৫ ছুঁই ছুঁই তপেন্দ্র মন্ডল বলছিলেন, ওই বছরই (৩১.০৩.১৯৮৩) ভাগীরথী এক্সপ্রেস চালু হয়েছিল। ঠিক এখন যেমন মানুষজন আনন্দ করছেন সেদিনও খুব আনন্দ হয়েছিল আমাদের। ফুল মালায় সাজানো জেলায় প্রথম এক্সপ্রেস ট্রেন চলবে বলে কথা। কঠোর নিয়ম কানুন। ঘনঘন চেকার উঠছে নামছে। কামরাতেই রেল খাবার দিত তখন। সেই ট্রেনের আজ যা হাল হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন যে কোনও ট্রেনে উঠলেই অবহেলার ছাপ থাকে স্পষ্ট। নোংরা বাথরুম থেকে বসার আসন সবই খারাপ। এই নতুন ট্রেনেরও হাল আর ক’দিন পর তেমনই হবে মনে হয়।”
আরও পড়ুনঃ নগরে প্রতিবাদ, গঞ্জে উৎসব