
সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ দিন সাতেক আগে বহরমপুরের বুকে খুন হয়েছেন তৃণমূল নেতা পুরকর্মী প্রদীপ দত্ত। খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও মূল দুষ্কৃতি এখনও অধরা। তার মধ্যেই রাত দুপুরে বিশেষভাবে সক্ষম এক টোটো চালককে খুন করে গায়েব হল খুনি। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার রাত বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে বহরমপুরের উত্তরে মোল্লাগরের কাছে। ঠিক তার পরের দিন বুধবার ভর দুপুরে শহরের দক্ষিণে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা খাটিকতলায় খোয়া গেল বাড়ির মালিকের বেশ কয়েকভরি গহনা। নগদ লাখ খানেকের বেশি টাকা। পরপর প্রায় একই ধরনের ঘটনায় প্রশ্নের মুখে শহরের নিরাপত্তা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে কিয়াশিস শেখ (৪৩) নামে বিশেষভাবে সক্ষম এক টোটো চালককে মোল্লাগরের কাছে তৃণমূল কার্যালয়ের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকতে দেখা যায়। ধারাল অস্ত্র দিয়ে তাঁর গলার নলি কেটে তাঁরই টোটো নিয়ে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতিরা। পুলিশ দেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করে। যদিও সেই টোটো নিয়ে দুষ্কৃতি উত্তরপাড়া মোড়ের দিকে যাওয়ার সময় ভাগীরথী সেতুর মুখে দুর্ঘটনার কবলে পরে। সেখানে লোকজন জড়ো হতেই টোটো ফেলে চম্পট দেয় সে। পুলিশ টোটোটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
একটি নতুন টোটোর দাম দেড় থেকে দু-লক্ষ টাকা। খুব কম দাম হলেও ৮০ হাজার টাকার নিচে নয়। পুরনো টোটোর দাম মেরেকেটে হাজার পঁচিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। পুলিশের দাবি, এই ঘটনার পেছনে মাদক কারবারিদের চক্র যুক্ত থাকতে পারে। এছাড়াও প্রদীপ দত্ত খুনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে নয়া খুনের ছক কষা হয়েছে কি না সেই বিষয়টাও ভাবাচ্ছে পুলিশকে।
দিন সাতেক আগে তৃণমূল নেতা প্রদীপ দত্ত উত্তরপাড়া এলাকাতেই খুন হয়েছেন। ছিনতাই হওয়া টোটোর অভিমুখও ছিল উত্তরপাড়া মোড়ের দিকে। লোকজন জড়ো হওয়ার কথা বলা হলেও দুর্ঘটনাগ্রস্থ টোটো ফেলে মুহূর্তে সব চোখে ধুলো দিয়ে অপরাধী গায়েব হয়ে গেল কী করে? ভাবছে পুলিশ। রাতের টোটো চালানোয় বিশেষভাবে সক্ষম কিয়াশিসকে অনেকেই চিনতেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, এর আগেও রাধারঘাট এলাকাতে নিহত টোটো চালকের উপর চড়াও হয়েছিল দুষ্কৃতিরা। স্বাভাবিকভাবেই সহজ ছকে দুষ্কৃতিরা কিস্তিমাত করতে চেয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। যদিও টোটো চালক খুনে বুধবার রাত পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি।
তবে শহরের আইনশৃঙ্খলা যে ভেঙে পড়ছে তা মানছেন শহরবাসী। বুধবার সকালে নিহত টোটো চালকের মৃত্যুর খবর থিতিয়ে পড়তে না পড়তেই ওয়াইএমএ মাঠ সংলগ্ন খাটিকতলা এলাকায় ভয়াবহ চুরি হয়ে যায় ভরদুপুরে। তিন তলা বাড়ির দুই ও তিন তলার ঘরের তালা ভেঙে দুষ্কৃতিরা নগদ টাকা ও সোনার গহনা নিয়ে চম্পট দেয়। সেই সময় সপরিবারে বাড়ির একতলায় ছিলেন পার্থ বিশ্বাস। চিত্রশিল্পী পার্থর দাবি, বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ তিনি ঘটনার কথা জানতে পারেন। পার্থ বলেন, ” পাশের বাড়ি থেকে খবর দেওয়া হয় তিন তলার ঘর থেকে ধোঁয়া বেড়চ্ছে।” খবর দেওয়া হয় দমকলে। খবর যায় বহরমপুর থানাতেও।
তিন তলায় পার্থের ভাই নিলয় বিশ্বাস থাকেন। পুজোর ছুটিতে স্কুল শিক্ষক নিলয় কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছেন। বুধবার সকালে কৃষ্ণনগরে এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন পার্থর মা। দো-তলা ও তিন তলার ঘর তালাবন্ধই ছিল। পার্থ বলেন, ” ধোঁয়া বেড়নোর কথা শুনে আমি তিন তলায় যেতে গিয়ে দেখি সদর দরজার তালা ভাঙা। দো-তলায় মায়ের ঘরের তালাও ভাঙা। একইভাবে দুষ্কৃতিরা ভাইয়ের তিন তলার ঘরের তালা ভেঙে তান্ডব চালিয়েছে সেখানে।” অবশ্য তিনি টুঁ-শব্দটিও পাননি বলে দাবি করেন। পাশেই তাঁর দিদিরও বাড়ি। এই ঘটনার বিন্দুমাত্র টের পাননি বলে দাবি করেন পার্থর জামাইবাবুও।
তাঁদের অনুমান, শব্দ এড়াতে দুষ্কৃতিরা অ্যাসিড জাতীয় কিছু ব্যবহার করে তালা ভেঙেছে ঘরের আলমারিরও। পার্থর ভাই যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরে গিয়ে দেখা যায় তাঁর স্ত্রী’র যাবতীয় শাড়ি পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে দুষ্কৃতিরা। ঘরের পাখা, এসিতেও আগুনের পোড়া দাগ। আলমারি ভাঙা হয়েছে পার্থের মায়ের ঘরের আলমারিরও। থানায় লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এই ঘটনারও তদন্ত শুরু করেছে। যেভাবে নিঁখুত অপারেশন চালিয়েছে দুষ্কৃতিরা তাতে ঘরের কোথায় কী থাকে তা দুষ্কৃতিরা আগে থেকেই জানত বলে পুলিশ মনে করছে। পরিবারের পরিচিত কেউ এই ঘটনায় জড়িত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুজোর মরশুমে শহরের অনেক বাসিন্দাই বেড়াতে গিয়েছেন। সেই সময় শহরের বুকে এমন ঘটনায় নিরাপত্তার প্রশ্নই বড় হচ্ছে। বহরমপুরের বাসিন্দা অর্ণব দত্ত বলেন, ” খাটিকতলার মতো জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এতবড় চুরি আটকানো না গেলে একটু কম জনবসতি এলাকায় চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঠেকানো মুশকিল। এসব দেখে বাড়ির বাইরে যেতেই ভয় করছে।”
আরও পড়ুনঃ দুর্গাপুজোর গ্রামীণ আনন্দে আজও মিশে আছে সম্প্রীতিই