সুহৃদ প্রযোজিত এই নাটকে অভিনয় করেছেন চোদ্দজন অভিনেতা। তারমধ্যে সুহৃদের ছ’জন। পরিচালক সহ বাকি সব যুগাগ্নির।

সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ ডিসেম্বরের শেষ ল্যাপেও জাঁকিয়ে শীত পরেনি বহরমপুরে। কিন্তু বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে এই শীত সন্ধ্যায় নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে নানান ধরনের থিয়েটার। ঋত্বিকের দেশ বিদেশের নাট্যমেলা শেষে শুরু হয়েছে সুহৃদের জাতীয় নাট্যোৎসব ২০২৪।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই উৎসবে সুহৃদ, বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ করে কৌশিক চট্টোপাধ্যায় রচিত নাটক ‘গুলি’। কৌশিক নিজেই সেই নাটকে অভিনয় করেছেন একসময়। নির্দেশনাও তাঁরই। প্রযোজনাও করেছিল তাঁর দল ‘শান্তিপুর সাংস্কৃতিক’। কিছু রদবদল করে বিরতিহীন ৯৫ মিনিটের সেই নাটক এখানে পরিচালনা করেছেন দেবাশিস সান্যাল।
একজন লেখক, তিনি লিখেই রোজগার করেন। তাঁর লেখা বই বেস্ট সেলার হয় বছরের পর বছর। তাঁর সেই সাফল্যেই তাঁর ভেতরে জন্ম নেয় এক ক্ষমতার। সেই ক্ষমতা এতই উচ্চ যে বিনা বাধায় পার পেয়ে যায় তাঁর যাবতীয় অন্যায়। কিন্তু তিনি কোনও অবস্থাতেই অস্বীকার করতে পারেন না তাঁর ওপরে ওঠার সিঁড়ির প্রতি ধাপের গল্পগুলো। কোনও মানুষই তা পারে না। অবচেতনে ঠিক সামনে এসে তাঁকে প্রশ্ন করে তাঁর বিবেক। এখানেও তাই, একটা গুলির আওয়াজে সেই লেখক তপোব্রত বসু যেন জেগে ওঠেন। গুলি তার মনে একটা ভয়ের জন্ম দেয়। সেই ভয় মৃত্যু ভয় ! সেই গুলি কে ছুড়ল তা নিয়ে নিজের মনেই তিনি খুঁজতে থাকেন আততায়ীকে। তাই নিয়েই এগোতে থাকে গল্প।
সে হতে পারে তাঁর ছোট বেলার বন্ধু মহসীন, যাঁর লেখা তিনি চুরি করেন। নিজের নামে লিখে পাঠিয়ে দিলে তা ছাপিয়ে দেয় শুকতারা। সে হতে পারে তাঁর স্ত্রী জয়া। যাঁর সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। মণীষার সঙ্গে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে নিজের স্ত্রীকে একতাল মাংসপিণ্ড ছাড়া কিছু মনে হয় না লেখকের। কিন্তু মণীষার গর্ভে যখন তাঁরই সন্তান জন্ম নেয়, তাকেও মেনে নিতে পারে না তপোব্রত। সবটাই তাঁর অহংকার আর ক্ষমতার বাহ্যিক প্রকাশ। আর একটি গুলির আওয়াজের জেরে তাঁর অবচেতনে সে সবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন তাঁর সামনে ক্রাচ হাতে হাজির হয় একজন মানুষ, যার চার বছরের মেয়েকে গাড়ি চাপা দিয়েছিল মদ্যপ তপোব্রত। সেও প্রতিশোধ নিতে চায়।
দেবাশিস যুগাগ্নির পরিচালক। কিছুদিন আগে এই মঞ্চেই মঞ্চস্থ হয়েছে যুগাগ্নি প্রযোজিত দেবাশিস পরিচালিত একটি নাটক ‘প্রফেসর মামলক’। তার তুলনায় এদিনের নাটকের মঞ্চ, আলো,আবহ এমনকি অভিনয় বেশ ভাল। তবে বহু প্রশংসিত কৌশিকের সেই নাটক যাঁরা দেখেছেন তাঁরা নিশ্চিত যেকোনও তুলনা এড়িয়েই যাবেন। পরিচালক বিপ্লব দে’র মতে, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে ওইদিন। বিভিন্ন দৃশ্যের ট্রান্সফরমেশন, মঞ্চ পরিমিত মনে হয়েছে তাঁর। কিছুক্ষেত্রে দুই পরিচালকের দৃশ্যভাবনা দু’রকম আসাটাই স্বাভাবিক।
তবে নাটকের ব্যকরণ ছাপিয়েও সেদিন নাটক শেষে বড় হয়েছে বহরমপুরে থিয়েটার পরিচালক ও অভিনেতার সঙ্কট। সুহৃদ প্রযোজিত এই নাটকে অভিনয় করেছেন চোদ্দজন অভিনেতা। তারমধ্যে সুহৃদের ছ’জন। পরিচালক সহ বাকি সব যুগাগ্নির। কোরিওগ্রাফ করেছেন মেঘমিতা চক্রবর্তী। মেঘমিতা, ঋত্বিক নাট্যদলেও কাজ করেন।
রাজনীতির মঞ্চে ‘জোট’ পরিচিত শব্দ। কলকাতায় থিয়েটারের নানানরকম পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্রে একজন পরিচালক, অভিনেতার অন্য দলে গিয়ে কাজ করার চল আছে। তাও রুটির প্রশ্নে। এক দলের অভিনেতার অন্যদলে অভিনয় করবার চল মফস্বল বহরমপুরে না থাকলেও সুহৃদের এদিনের নাটকের পর তা শুরু হল বলাই যায়। অর্থাৎ রেষারেষি কমছে মান নিয়ে। জোটবদ্ধ হচ্ছেন একে অপরে। তার কারণ, রোজগার বা মানের প্রশ্নে নয়, অভিনেতা কিংবা পরিচালকের ঘাটতি ঢাকতে বন্ধুর পাশে দাঁড়াচ্ছে বন্ধু।
কারণ, উঠে আসছে না নতুন পরিচালক। আগ্রহ হারাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। তৈরি হচ্ছে না অভিনেতা। সেই থোড় বড়ি খাড়া। খাড়া বড়ি থোড়। অথচ এই বহরমপুর যা থিয়েটারের শহর নামে পরিচিত সেই শহরেই জন্ম হয়েছে কত বড় বড় নাট্যাভিনেতা, পরিচালকের। একইভাবে আলোকশিল্পীও সব দলের সেই একজনই, শ্যামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।
স্বাভাবিকভাবেই মান কমছে থিয়েটারের। মুখ ফেরাচ্ছে দর্শকও। বিপ্লব অবশ্য বিষয়টিকে এইভাবে দেখছেন না। তিনি বলেন, “যে কোনও পরিচালক বা নির্দেশকের বাসনা তিনি যা সৃষ্টি করবেন তার জন্য যেন তিনি অভিনেতার কাছ থেকে সেরাটাই পান। আর তা পেতে তিনি তাঁর পছন্দমতো অভিনেতাদের দিয়েই সেই কাজ করতে পারেন। সেটা দলেরই হতে হবে এমন নাও হতে পারে। সব দলে সেইরকম অভিনেতা নাও থাকতে পারে।”
আলোকশিল্পী উঠে না আসার ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের নাটকের পেছনে কাজ না করতে চাওয়ার প্রবণতা, থিয়েটারের আনুষঙ্গীক বিষয় নিয়ে পড়াশোনার প্রতি তাদের অনীহাকে দায়ী করছেন দেবাশিস। একইসঙ্গে তাঁর দাবি, ” আলোর সেটের যে দাম তা কেনার মতো পুঁজি আমাদের মতো দলগুলির অনেকেরই নেই।” তবে অভিনেতার ঘাটতি ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি, “জীবিকা সামলে থিয়েটার করতে আসা মানুষগুলো আসেন থিয়েটারকে ভালবাসেন বলেই। থিয়েটার করে পেট চললে হয়ত এই অসুবিধা হত না।”
আয়োজক দলের কর্তা হরপ্রসাদ দাস স্পষ্টতই নিজের দলের অক্ষমতার কথা স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, “আমি যদি নিজের ক্ষমতাতেই নাটকটা নামাতে পারব তাহলে ওদের কেন ডাকব?” তিনি মানছেন বহরমপুরে থিয়েটারের পরিচালক তেমনভাবে উঠে আসছে না। তেমনি অভিনেতারও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। তাই থিয়েটারের মান ধরে রাখতে “মিলেমিশে থিয়েটার করতে হচ্ছে। না হলে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে লোকে দেখবে কেন?” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাট্য পরিচালক বলেন, “আধুনিকতার অভাব। অনেক বর্ষীয়ান অভিনেতার থেকে নতুন প্রজন্ম ভাবতে পারে ভাল। কিন্তু তাকে গ্রহণ করবার মতো মানসিকতা বহরমপুর কেন বাংলার অনেক দিকপাল পরিচালকেরই নেই। তাই তাদের আগ্রহও নেই।”
ঋত্বিক, যুগাগ্নি-র মতো দলকে একসময় থিয়েটারের স্কুল হিসেবে গণ্য করা হত বহরমপুর তথা জেলায়। সেখানে ওয়ার্কশপের মাধ্যমেও অনেক অভিনেতা উঠে এসেছে। সরাসরি স্বীকার না করলেও সেখানেও দেখা দিয়েছে ঘাটতি, আড়ালে মানছেন সকলেই। তথ্য বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে পড়াশোনার চল বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক। কোথায় তারা? মফস্বলে মঞ্চ বাঁধা ছেড়ে থিয়েটারের নতুন প্রজন্ম ডানা মেলছে কলকাতায় নেশা-পেশা মেলাতে। আর অন্যদিকে আলো কমে আসছে মফস্বলে।