কল্পনার অতীতঃ বাস্তব বনাম অতিবাস্তবের নাটক

Social Share
নাটকের একটি দৃশ্য। ছবিঃ তানিয়া মন্ডল

সন্দীপন মজুমদারঃ ঋত্বিক আয়োজিত দেশবিদেশের নাট্যমেলায় ১৩ই ডিসেম্বর বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ হল থিয়েটার প্ল্যাটফর্মের প্রযোজনায় ‘কল্পনার অতীত”। মঞ্চ,আলো, নাটক ও নির্দেশনার দায়িত্বে দেবাশিস। দেবাশিসের পরিচালনা ও নাট্যপ্রয়োগের খ্যাতি ইতিমধ্যেই সুপরিজ্ঞাত। সদ্য দুই দিন আগে এই নাট্যমেলাতেই দেবাশিসের নির্মাণে মঞ্চস্থ হয়েছে অনীকের আক্ষরিক নাটকটি এবং সব বয়সের দর্শকের কাছে তুমুল প্রশংসিত হয়েছে। অধিকন্তু এই নাটকে যুক্ত হয়েছে বাংলার মঞ্চজগতের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক দেবশংকর হালদারের উপস্থিতি। ফলে প্রত্যাশার পারদ চড়েছে।

এই নাটকটি অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য ঘরানার। অ্যাবসার্ড ড্রামার ঘরানাতেই একে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। কারণ গোটা নাটকেই দেখা যায় বেশ কিছু জিনিস উলটো পথে হাঁটছে। তারমধ্যে প্রথমেই আছে দেবশংকর হালদার অভিনীত টুকাই চরিত্রটির বয়স যা উলটো দিকে হাঁটছে। তাকে তার মা চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন কারণ এই বিষয়টায় তার আপত্তি আছে – সে ছোটো হতে চায় না। আসলে শুধু ছোটো হওয়া তো নয় তাকে করে তুলতে চাওয়া হয় বোধবুদ্ধিহীন ,পরনির্ভরশীল এক অস্তিত্বে্র আধার। চারিপাশে সবাই যেন এভাবেই ক্রমশ তাদের বুদ্ধিবৃত্তিগত ক্ষমতা ক্রমাগত হারিয়ে, ক্রমাগত ভুলতে ভুলতে, ক্রমাগত পড়াশোনা না করতে করতে সেটাকেই চলা বলে ধরে নেয়। এটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক।

চারিপাশে সবাই যেন এভাবেই ক্রমশ তাদের বুদ্ধিবৃত্তিগত ক্ষমতা ক্রমাগত হারিয়ে, ক্রমাগত ভুলতে ভুলতে, ক্রমাগত পড়াশোনা না করতে করতে সেটাকেই চলা বলে ধরে নেয়। এটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক।

বাকিদের সঙ্গে টুকাইয়ের তফাত যে সে অনেক কিছু ভুলতে পারে না—তার কাছে কোনোকিছুর নিয়ন্ত্রণে থাকার চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য অনেক বেশি কিন্তু এই চাহিদা ‘ রিভার্স গ্রোথ প্রোজেক্ট’এর বুলডোজারের তলায় চাপা পড়ে যায়। সে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারায়, তার প্রকাশভঙ্গী অস্পষ্ট হয়,তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। যেন এক আদিম প্রাকৃতিকতার দিকে যাত্রা করে মানবসভ্যতা যেখানে শ্বাপদসংকুল অরণ্যে তার অস্তিত্ব বিপন্ন। এই অবদমনে পরিবার, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির ভুমিকা স্পষ্ট হয়ে আসে যখন মায়ের হাতের ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ধারালো অস্ত্রের মত নেমে আসে বাবাইয়ের শরীরে যা তাকে চুপ করিয়ে দেয়। শেষে অবশ্য প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়।

কারণ টুকাই অন্তর্ঘাত চালিয়েছিল এই ছোটো করে তোলার প্রক্রিয়ায়। আসলে সে ছোটো হয় নি— তার বুদ্ধিবৃত্তি, কন্ঠস্বর কিছুই হারায় নি।সে ভান করেছিল নিজেকে টিঁকিয়ে রাখতে। এভাবেই মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার, ভুলিয়ে রাখার, তাকে শিশুসুলভ আয়োজনে ঘিরে রাখার প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ঘাত চলে।এই নাটক বাস্তবধর্মী নয়। বাস্তবতার মাত্রাকে বিপরীত খাতে বইয়ে দিয়ে সামাজিক সত্যের অনুসন্ধানই নাটককারের উপজীব্য। কিন্তু সেই অতিবাস্তবের আবার নিজস্ব লজিক থাকে, থাকে সুসমঞ্জসতা। সেখানে কিছু ঘাটতি থাকায় সমস্যা হয়েছে।

সত্তর দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন বলতে যদি নকশাল আন্দোলনের কথাই ধরা হয় তাহলে সেখানে প্রতিবাদ ছিল সত্য কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিগত জায়গাটা কি খুব শক্তিশালী ছিল ? সেখানে অযুক্তি আর আবেগ কি মননকে ছাপিয়ে অনেক বালখিল্য কাণ্ড ঘটায় নি ?

একমাত্র বাবাইয়ের সঙ্গিনী বালিকাটির ক্লাসে উপর্যুপরি সাফল্যের সঙ্গে ফেল করা ছাড়া অন্য চরিত্রগুলির মধ্যে—যেমন টুকাইয়ের মা বা চিকিৎসক—এই রিভার্স গ্রোথ প্রসেসের কোন প্রভাব দেখা যায় নি। অর্থাৎ ফ্যানটাসি যেখানে সার্বিক প্রয়োগে আপাত বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে সেখানে ন্যারেটিভের লজিকে কোথাও যেন টান পড়েছে। শেষে বাবাই সত্তর দশকের আন্দোলনের নামে কেন জয়ধ্বনি দেয় সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

সত্তর দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন বলতে যদি নকশাল আন্দোলনের কথাই ধরা হয় তাহলে সেখানে প্রতিবাদ ছিল সত্য কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিগত জায়গাটা কি খুব শক্তিশালী ছিল ? সেখানে অযুক্তি আর আবেগ কি মননকে ছাপিয়ে অনেক বালখিল্য কাণ্ড ঘটায় নি ? আসলে দেবাশিস বৌদ্ধিক বামনত্বকে প্রশ্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু তার নাটকের ন্যারেটিভে বিষয়টির প্রতি সুসংহত থাকতে পারেননি সবসময়। দেবাশিসের নাটকে গান বা প্রপসের যে চমকপ্রদ ব্যাপার দেখা যায় এখানে ন্যারেটিভের প্রয়োজনেই সেসব সীমায়িত থেকেছে। এই সংযমবোধকেও তারিফ জানাতে হয়।

আর নাটককে টেনে নিয়ে যাবার জন্য দেবশংকরের অসাধারণ অভিনয় ছাড়াও মায়ের চরিত্রে সুপর্ণা দাস ,চিকিৎসকের চরিত্রে ভাস্কর মুখার্জি আর বালিকার চরিত্রে ডানা রায় চমৎকার অভিনয় নজর কাড়ে। বিশেষত দেবাশিসের সুকন্যা ডানার মধ্যে আগামী দিনে বাংলা রঙ্গমঞ্চের একজন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করলাম। ‘ কল্পনার অতীত’ শেষাবধি আমাদের বৌদ্ধিক নির্লিপ্তির কারাগার থেকে মুক্ত করে কল্পনার সাম্রাজ্যে পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখায়। আমাদের পরিণতিবোধ না হারানোর কথা বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights