নির্বাচনের শেষ ল্যাপে ফিরল মেরুকরণের সুড়সুড়ি

Social Share

বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ শোনা যায় অধীর চৌধুরীর সঙ্গেও একসময় ভারত সেবাশ্রম সংঘের এই কার্তিক মহারাজের যোগাযোগ ছিল। এখন তা নেই বললেই চলে। আর মহারাজ মুখে যাই বলুন না কেন মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে কার্তিক মহারাজ পরিচিত নাম সবাই তা মানে। মুখ্যমন্ত্রীর পরে অধীরও সে প্রসঙ্গ এনেছেন তাঁর বক্তব্যে। তবে সেই কথা প্রকাশ্যে এনে মুখ্যমন্ত্রী হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন না কি সুক্ষ্মভাবে ধর্মীয় মেরুকরণকে উসকে দিয়ে নির্বাচনের শেষ বেলায় আস্তিনে লুকোনো তাস বের করলেন এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে বাংলার জল হাওয়ায়।

বহরমপুর লোকসভার নির্বাচন মিটে গিয়েছে ১৩ মে। সেদিন ছিল সোমবার। ওই সপ্তাহের শনিবার আরামবাগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনী জনসভা করেন। আজ সোমবার সেখানেই ছিল নির্বাচন। সেদিনের নির্বাচনী সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ সাধু-সন্তদের তাঁর ভাষণে হাজির করেন। একাংশ সাধু-সন্তদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও উগরে দেন। টার্গেট করেন বহরমপুরের কার্তিক মহারাজকে। যা নিয়ে আসরে নেমেছে বিজেপি ও তার শাখা সংগঠন।

এর আগে বিশেষ করে নদিয়া, মুর্শিদাবাদের প্রায় প্রত্যেক নির্বাচনী সভায় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণ সিএএ ও এনআরসিতেই আটকে ছিল। কিন্তু পঞ্চম দফার আগে তিনি আর একটা পক্ষকে চাগিয়ে দিলেন সাধু সন্তদের নির্বাচনী মঞ্চে টেনে এনে। সুযোগ হাতছাড়া না করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবার সোজা ব্যাটে খেলে দেশজুড়ে হিন্দুত্বের জয়ঢাক পিটিয়ে দিলেন মনের সুখে। বহরমপুরের মতো এক সম্প্রীতির শহর দেখল সাধু সন্তদের মিছিল।

এবার দিন কয়েক পিছিয়ে যাওয়া যাক। বহরমপুর লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ও নির্বাচনের দিন সংবাদ শিরোনামে উঠে এলেন ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। যিনি হিন্দুরা ৩৭ শতাংশ মুসলমানরা ৬৩ শতাংশের মতো ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন নির্বাচনের প্রাক মূহুর্তে। নির্বাচনের দিন বললেন “বহরমপুর কেন একজন মুসলিম এমপি পাবে না?” যা নিয়ে ফের চকচক করে উঠল বিভেদের কাঁটাতার।

নির্বাচনের দিন সংবাদ শিরোনামে থাকা বেলডাঙা বিধানসভার নির্বাচন চাক্ষুষ করবার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে শক্তিপুর, সোমপাড়া ছাড়াও একাধিক জায়গায় বিজেপি’র ভোট বেশি হয়েছে বলে বিজেপি কার্যকর্তারা যতটা দাবি করেছিলেন, তৃণমূলের নেতারা কিন্তু তুলনায় রেখেঢেকে কথা বলেছিলেন।

মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় শনিবার ছিলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের বেলডাঙা শাখার অধ্যক্ষ স্বামী প্রদীপ্তানন্দ ওরফে কার্তিক মহারাজ। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, তিনি তৃণমূলের এজেন্টকে বসতে দেননি। তিনি সাধু সন্ত হতে পারেন না। তিনি ডাইরেক্ট পলিটিক্স করেন। কিন্তু কোন দল করেন তা তিনি সরাসরি বলেননি। নরেন্দ্র মোদি পাল্টা প্রশ্ন তুললেন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দলের বিধায়কের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে নীরব। অথচ সাধুদের ব্যাপারে সরব। যা কার্যত বিভেদের রাজনীতিকেই উসকে দিল পঞ্চম দফার নির্বাচনের আগে। বঙ্গবাসী এটাই ধারণা করলেন সাধু-সন্ত মানেই হিন্দু মানেই বিজেপি আর ইমাম মোয়াজ্জেম মানেই মুসলমান মানে তৃণমূল। এদের আর কোনও রাজনৈতীক পরিচয় নেই।

ইদানিং ভারত সেবাশ্রম সংঘের বেলডাঙা শাখায় বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী যতবার প্রকাশ্যে গিয়েছেন, অন্য দলের নেতাদের সেখানে প্রকাশ্যে যেতে দেখা যায়নি। তৃণমূলের মন্ত্রী থেকে বিজেপি’র বিরোধী দলনেতা হয়ে শুভেন্দু যতবার মুর্শিদাবাদের মাটিতে পা রেখেছেন আসা যাওয়ার পথে প্রায় প্রত্যেকবারই ছুঁয়ে গিয়েছেন ভারত সেবাশ্রম সংঘ।

আরও পড়ুনঃ খড়গের ডিগবাজি

ভাল করে লক্ষ করলে দেখা যাবে, পঞ্চম দফা পর্যন্ত হিন্দু না ওরা মুসলিম এই ধন্দে না গিয়ে ভোটাররা নিঃশব্দে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। সেই সুবাদে ধরে নেওয়া হচ্ছে সেই ভোট শাসকের বিরুদ্ধে পড়েছে। হয় বিজেপি না হয় জোটের পক্ষে পড়েছে অধিকাংশ ভোট। তা কতটা খাঁটি তা গণনা না হওয়া পর্যন্ত বলা বেশ খানিকটা মুশকিল। যদিও নির্বাচনের পর এলাকার মানুষজনের আড্ডা-কথায় ব্যালট বাক্সের একটা ছবি ধরা পরে। সেই খবর পুলিশ মারফত কী মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও পৌঁছেছিল? কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতির কাছেও পৌঁছেছিল? সত্যিই কি বেলডাঙাবাসীর মতামত অনেকটাই কার্তিক মহারাজ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবার? না হলে একুশের নির্বাচনে এ প্রশ্ন ওঠেনি কেন?

এলাকার মানুষজনের সঙ্গে ভর সন্ধ্যায় কথা বলবার সময় সে উত্তরের থেকেও বড় হয়ে উঠল আমরা ওরা। কেউ বললেন ” দেখলেন তো আমরা বলেছিলাম ওদের থেকে রক্ষা করতে একমাত্র দিদিই ভরসা” আর একপক্ষ বললেন উল্টোটা। বললেন ” দিদির গোঁসার কারণ বুঝলেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া এদেশকে কেউ শুধরোতে পারবে না।”

শুনুনঃ সমুদ্রে বিশ্বনাথ

নির্বাচন শুরুর পর থেকেই বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থীদের প্রচারে যে ধর্মীয় মেরুকরণের বোঁটকা গন্ধ এলাকা থেকে উবে গিয়েছিল। নির্বাচনের শেষ ল্যাপে এসে সেই গন্ধই যেন ফিরে এল দুই ফুলের নির্বাচনী প্রচারে। ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রচার আগামী দু-দফায় আদৌ কোনও গুরুত্ব পাবে কি না তার জন্য অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু ঘুরিয়ে ভিন্ন ফুলের দুটি দল মেরুকরণের রাজনীতিতেই যে শেষ ভরসা খুঁজলেন তা অবশ্য বলে দেওয়াই যায়।

(মতামত ব্যক্তিগত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights