প্রফেসর মামলক, যুগাগ্নির প্রাসঙ্গিক প্রযোজনা

Social Share

সংবাদ হাজারদুয়ারি ওয়েবডেস্কঃ “বঙ্গরঙ্গ মিলন মেলা”র দ্বিতীয় দিন যুগাগ্নি নিজেদের প্রযোজিত ‘প্রফেসর মামলক’ নাটক মঞ্চস্থ করল বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে।

এই নাটকটি লিখেছিলেন জার্মান নাট্যকার ফ্রেডরিশ ভোলফ, ১৯৩১ সালে। ইহুদিদের ওপর নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের কাহিনীই এই নাটকের মূল উপজীব্য। নাট্যকার দেখিয়েছিলেন, চিকিৎসকের কাছে রোগীর অসুখ সারানো মুখ্য হলেও শাসকের কাছে তা গৌণ। কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ে কে না জেনেছে ইহুদিদের ওপর নাৎসি বাহিনীর ত্রাসে কাটানো সেই দিনগুলির কথা। আনা ফ্রাঙ্ককে ভোলেনি বিশ্ব। জার্মানির বাসিন্দা আনাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল নাৎসি বাহিনীর ত্রাসের কারণে।

১৯৩৩ সালে তাঁরা সপরিবারে চলে যান হল্যান্ডে। সেখানেও রেহাই পাননি। হল্যান্ড দখল করে হিটলার সেখানেও পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে ইহুদিদের ওপর অত্যাচার শুরু করে দিয়েছিল। প্রাণ হাতে হল্যান্ডে গোপন ডেরায় সপরিবারে আশ্রয় নিতে হয় অটো ফ্রাঙ্ককে। গন্ধ শুঁকে সেখানেও হাজির হয় হিটলার বাহিনী। তাঁদের ঠাঁই হয় বন্দি শিবিরে। শোনা যায়, ফ্রাঙ্কের দিদি সুন্দরী মার্গারেটের ওপর পড়েছিল শাসকের কু-নজর। তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়নি।

এখনও সময় পক্ষে নেই। সংখ্যালঘুদের জন্য শাসক ‘হন্তারক’ই। বিরোধীকে বলতে না দিয়ে উল্টে বিরোধীকে ভয় দেখায় শাসক। প্রয়োজনে মেরেও ফেলে। গণতন্ত্র শব্দবন্ধকে প্রহসনে পরিণত করে একনায়কতন্ত্র চালিয়ে যাওয়ার উদাহরণ টানলে কাগজ কম পড়বে।

১৯৬৪ সালে ফ্রেডরিশের সেই নাটকের বাংলা অনুবাদ করে তা মঞ্চস্থ করেছিলেন উৎপল দত্ত। তিনি তাঁর কৈফিয়তে লিখেছিলেন, ” নাৎসিরা ক্ষমতা দখল করে শুধু কমিউনিস্ট নয়, গণতান্ত্রিক সমস্ত পার্টিকে বেআইনী করে দেয়।” আজও তাঁর সে নাটক সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কি দেশে কি বিদেশের প্রেক্ষিতে। আক্ষরিক অর্থে এখন নাটকেরও দুঃসময়। নাটকের স্ক্রিপ্ট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিবাদী শব্দগুচ্ছ। গ্রান্ট দেওয়ার প্রলোভনে শাসকের লাল চোখ নজরে রাখছে বিরোধী কি না ? এমন সময় “প্রফেসর মামলক”কে প্রথমবার মঞ্চে হাজির করল যুগাগ্নি। ” যখন লড়াই করা দরকার, তখন লড়াই এড়ানোর চেয়ে বড় অপরাধ আর নেই।” তা বুঝেই হয়ত।

এমনিতেই নাটক থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়েছে। থিয়েটার কর্মী জোগাড় করতে গিয়ে কার্যত মফঃস্বলের নাট্য সংস্থা গুলোর দিশেহারা অবস্থা। সব দিকে চাপে থাকা নাট্যদলগুলিও নাটক নিয়ে বাঁচতে খেই হারিয়ে ফেলছে। বাদ নেই কলকাতার প্রচার সর্বস্ব, গালভরা নামের বেশ কিছু নাট্যদলও। এমন সময় ৫১ বছর বয়সী যুগাগ্নির কাছে প্রত্যাশা থাকলেও পরিচালক দেবাশিস সান্যাল এই সময়ে দাঁড়িয়ে ঝুঁকিই নিয়েছেন এতবড় গুরুগম্ভীর একটি নাটক মঞ্চায়নের।

রবিবার থেকে শুরু হওয়া যুগাগ্নির বঙ্গরঙ্গ মিলন মেলার প্রথমদিন দর্শক তেমন হয়নি। প্রায় দু-ঘন্টা কুড়ি মিনিটের একটি নাটক দেখতে তুলনায় বেশি বহরমপুরের নাট্যপ্রেমী মানুষজন রবীন্দ্রসদনে এসেছিলেন সোমবার। বাইশ জন অভিনেতা, অভিনেত্রী। মোট ৩৩ জনের দল এই নাটকের পিছনে পরিশ্রম করেছে। মঞ্চ, আবহ সঙ্গীত, আলো প্রশংসনীয়। এলেন মামলক চরিত্রের অভিনেতা শিপ্রা সেন, আর্নস্ট চরিত্রের অভিনেতা শ্যামল দাসের অভিনয়ে ছিল পেশাদারিত্বের ছাপ। কিন্তু টিম হিসেবে বেশ নড়বড়ে লেগেছে এদিন যুগাগ্নিকে।

অনেকে চরিত্রে ঢুকতেই পারেননি। জাইডেল ( সুপ্রীয় মুখোপাধ্যায় ) শেষ পর্যন্ত আবেগেই গোল খেয়েছেন। পুরো নাটক জুড়ে ডাক্তার হেলপাখের মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণ বিব্রত করেছে দর্শককে। ডাক্তার ইঙ্গে চরিত্রাভিনেতাও ত্রুটি এড়াতে পারেননি। নাটকের বেশ কয়েক জায়গায় তাঁর অভিনয় ভাল লাগলেও মূল চরিত্র প্রফেসর হ্যান্স মামলক শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেননি। তরুণ অভিনেতা হিসেবে রল্ফ ও রুথ মামলকের চরিত্রাভিনেতারা আগামীদিনে আরও ভাল করবে আশা করাই যায়। তবে পুরো নাটকটি আরও একটু সম্পাদনা করলে নাটকটি আরও গুছিয়ে করা যেত। সব ত্রুটি সারিয়ে আগামী দিনে এই নাটক আরও বেশ কিছু রজনী যে পার করবে তা প্রথম শোয়ের পর নিশ্চিত বলা যায়।

আরও পড়ুনঃ ‘সওদাগরের নৌকা’য় কি চাপতে চায় জেন ওয়াই বা জে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights