
বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ রাজনীতির সজ্ঞা অনেক পোড় খাওয়া রাজনীতিকও ঠিকমতো দিতে পারেন না। আবার আপাতদৃষ্টিতে যাঁকে রাজনীতির ঘুঁটি বলে মনে হয়, তিনিই যে স্বক্ষেত্রে রাজনীতির ‘কিং মেকার’ তা ঠাওর হতে বেলা বয়ে যায়। বাংলার মহারাজ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর রাজনীতিক বলেই চেনে ময়দান।
তিনি কোনও ধ্বজাধারী রাজনীতিক নন। কিন্তু বাংলা ক্রিকেটের মসনদের চাবি কাঠি যে তাঁরই হাতে, তা সিএবি-র খবর রাখা আম-আদমি ভালোই জানেন। ২০২৪-এর মাঝ অক্টোবরে সবদিক থেকে ব্যস্ত প্রাক্তন ক্রিকেটার, দেশের ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক, রাজ্য ও দেশের প্রাক্তন ক্রিকেট ক্রীড়া প্রশাসক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বহরমপুরে ঢুঁ মেরে গেলেন। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন বিশ্বরূপ দেও। সিএবি-র বাইরেও এখন যাঁর পরিচিতি মূল ধারার একজন রাজনীতিক হিসেবেও।
কীজন্য বহরমপুরে তাঁদের দলবেঁধে আসা, সেই প্রশ্নই লক্ষ্মীবারে ঘুরল স্টেডিয়ামের প্রতিটি ঘাস চেনা জেলার প্রাক্তন খেলোয়ার, অভিজ্ঞ ক্রীড়া প্রশাসকদের মধ্যে। গত মাসে কাশিমবাজারে পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে মুর্শিদাবাদ জেলা ক্রীড়া সংস্থা ঘুরে গিয়েছেন আর এক প্রাক্তন ক্রীড়া প্রশাসক অভিষেক ডালমিয়াও।
২০১৫ সালের একটি প্রকল্প, যখন সিএবি ভেবেছিল, জেলায় জেলায় ক্রিকেট কোচিং সেন্টার গড়ে তোলা হবে প্রতিভার অন্বেষণে, পাশাপাশি দু’পয়সা সিএবি’র ভাঁড়ারেও আসবে। মুর্শিদাবাদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার নিজস্ব ক্রিকেট অ্যাকাডেমির মোড়কে সেই প্রকল্পেরই ঘুরিয়ে এদিন উদ্বোধন করেন সৌরভ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সাদামাটা সেই প্রকল্পের উদ্বোধনের জন্য রাজ্যজুড়ে পদাধিকারীদের আমন্ত্রণ। তা যে নয় টের পেয়েছেন মাঠের অভিজ্ঞ দর্শকও।
কারণ প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়ার নাম জুড়ে সিএবি ঘোষিত সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল অন্য জেলার মতো মুর্শিদাবাদেও। তবে সেটা ২০১৮ সালে। যদিও শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল সেই কাজ। দু-খেপে ১২ লক্ষ টাকা সিএবি মিটিয়ে দিলে মুর্শিদাবাদ জেলা ক্রীড়া সংস্থা সেই কাজ শেষ করে কোভিড কালে। ঘটা করে তার উদ্বোধন আর হয়নি।
সেখানেই এক লক্ষ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয়ে একটি বোলিং মেশিন বসায় ডি এস এ। বৃহস্পতিবার তারও উদ্বোধন করেন সৌরভ। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধিরা। উপস্থিত ছিলেন ঋদ্ধিমান সাহার কোচ শিলিগুড়ির জয়ন্ত ভৌমিকও। সবাইকে একমঞ্চে এনে সৌরভ প্রাথমিকভাবে ঠিকই করতে পারলেন না তিনি এই সভায় কী বলবেন?
মুর্শিদাবাদের বর্তমান জেলাশাসক রাজর্ষী মিত্র যে জেলার খেলার ভোল বদলাতে উদ্যোগী হয়েছেন সে খবর সৌরভের কাছে ছিল। তাই তাঁর প্রশংসা ( না কি তাঁকেও হাতে রাখা) দিয়েই শুরু করলেন নিজের কথা। গুরুত্ব দিলেন জেলার খেলোয়ারদের। উদাহরণ হিসেবে তুলে আনলেন ঋদ্ধিমান, অশোক দিন্দা, লক্ষ্মীরতন শুক্লার কথাও। গুরুত্ব দিলেন জেলার খেলার দায়িত্বে থাকা লোকজনকে। একসময় আদায় কাঁচ কলায় সম্পর্ক ছিল বিশ্বরূপ আর সৌরভের। সেই বিশ্বরূপ এদিন সৌরভের প্রশংসা করার পাশাপাশি কাটআউট খোঁচা দিয়ে সৌরভকে কী পরোক্ষে বুঝিয়েছেন বিজ্ঞাপণ নয় আসলে প্রয়োজন প্রকৃত খেলোয়ার তৈরি করা ? প্রশ্নটা মাঠের অনেকেই করলেন। ক্রিকেট সেন্টার তৈরির মূল মাথা যে বিশ্বরূপই তা জানিয়ে সৌরভ অবশ্য পাল্টা প্রশংসা করেন বিশ্বরূপের।
রাজনীতি বড় গোলমেলে। যে জানে বাপি বাড়ি যা মেজাজে কখন খেলা ঘোরাতে হয় সেই তাকেও তা নিখুঁত জানতে হয়। তবুও সতর্ক থাকতে হয়। ২০২৫-এ সিএবি-র নির্বাচন আর খুব বেশি দূরে নয়। রাজ্যের শাসক শিবিরেরও সিএবি নিয়ে যে খুব মাথাব্যথা আছে তেমন নয়। তবুও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বেহালার গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারকেই যে নির্বাচনে খোলা মাঠ দেওয়া হবে তেমনটাও নয়। একটি ভোটের অধিকারী জেলা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে নির্বাচনে তা শাসকমাত্রই জানে। তাই দাদা স্নেহাশিষকে সিংহাসনে রেখে সৌরভ বহরমপুরে বসে মাপতে চাইলেন কোন পক্ষে জেলা।
স্নেহাশিষ বা সৌরভ বা অভিষেক যে সিএবির মসনদে ২০২৫ এর নির্বাচনে ফের ফিরবেন না, তা মহারাজ বিলক্ষণ জানেন। তবে কে? যাকে আস্তিনে রেখে এদিন জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই সিএবি-র নির্বাচনের জল মেপে গেলেন সৌরভ ? ক্রমশ প্রকাশ্য।
মুর্শিদাবাদ জেলার খেলার মান অনেক উন্নত হয়েছে, প্রায় সমস্ত খেলায় রাজ্য স্তরে ভালো রেজাল্ট দেখা যাচ্ছে।