বিদ্যুৎ মৈত্র, বহরমপুরঃ মাথা ঘুরেই হোক কিংবা অন্যমনস্কভাবে চলতে গিয়েই হোক মেঝেতে পড়ে যান ইন্দ্রপ্রস্থ এলাকার রানি ঘোষ। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক টুকরো হয়ে যায় হিপ বোন। অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? কোন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে? বাড়ির লোকজন দিশেহারা। এমনিতে কারও মনেও পড়ে না মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কথা। একে সরকারি হাসপাতাল তার ওপর সেখানে চিকিৎসা করেন সদ্য পাশ করা ডাক্তারি পড়ুয়ারা। যাদের শরীরেই এখনও পড়ুয়ার গন্ধ, চালচলনেও ছাত্রবেলা।
তাঁদের ভরসায় সেখানে যাওয়া মানে জীবন বাজি রেখে চিকিৎসা করানো। তাই বহরমপুরের মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে বেসরকারি চিকিৎসালয়গুলি। যদিও সেখানে চিকিৎসার আড়ালে যে লম্বা ফাঁদ পাতা থাকে তা টের পান রোগীর বাড়ির লোক সেখানে পৌঁছনোর পর। এক্ষেত্রেও তাই হয়। রানির ছেলের সুজিতের পরামর্শ মেনে বহরমপুর রেল স্টেশন সংলগ্ন একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক দেখে বললেন “অপারেশন ছাড়া গতি নেই।” বাড়ির লোকজনও সেই মানসিকতা নিয়েই গিয়েছিলেন। সালটা ২০১৬- র মাঝামাঝি।
বেশ কয়েক বছর আগেও রানির হিপ জয়েন্ট ভেঙে গিয়েছিল। সেবারও অপারেশন ছাড়া গতি ছিল না। কিন্তু সেবার যে ডাক্তার অপারেশন করেছিলেন এবার তাঁর বাজার মন্দা। বাজার চলতি মানুষজনের মুখে তখন ওই বেসরকারি নার্সিং হোমেরই রমরমা। আর তার সুবাদে সুনাম বেড়ে ছত্রিশ ইঞ্চি হয়ে যায় সেখানকার চিকিৎসকদেরও। তবে কার জন্য কার দর সেই বিতর্ক চলতেই থাকে। যাই হোক সেখানে পৌঁছনোর পর যথারীতি দাম দর করে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হয় আশি ছুঁই ছুঁই রানিকে।
কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পর ওটি থেকে চিকিৎসক বেড়িয়ে বললেন ” যে পাতটা লাগানো হবে তার একটি স্ক্রু শিলড প্যাকেটে নেই। ওটা আমরা বাইরে থেকে দিয়ে দিতে পারব। তারজন্য দাম লাগবে আরও পাঁচ হাজার টাকা।” সুস্থতা যেখানে লক্ষ্য সেখানে পাঁচ হাজার কেন মায়ের জন্য জীবন দিতেও পিছপা হবেন না কেউ। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অপারেশন মিটে যায়। রোগীও সুস্থ হয়ে যান তাড়াতাড়ি। কিন্তু রোগীর ক্ষতস্থানের সেলাই কাটাতে আর নার্সিংহোমে যেতে হয়নি বাড়ির লোকজনকে।
যেতে হয়েছিল অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসকের চেম্বারে তাঁরই পরামর্শে। সেখানে গিয়ে বাড়ির লোককে সেই চিকিৎসক বলেছিলেন “একটা সেলাই কাটার সিজার কিনে নিয়ে আসুন।” বাড়ির লোক শুনে থ হয়ে অস্ফূটে চিকিৎসকের সামনেই বলে ফেলেন “মানে?” চিকিৎসক ফের বলেন “হ্যাঁ। সিজার না আনলে আমি সেলাইটা কাটবো কী করে? আমার কাছে তো আর সিজার নেই।” সেই চিকিৎসকের নাম সন্দীপ ঘোষ। দক্ষ অর্থপেডিক সার্জেন। আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সদ্য প্রাক্তন অধ্যক্ষ। যাঁকে জেরায় জেরায় জেরবার করে তুলেছে সিবিআই। তিনিই সেদিন সুজিত কিনে আনা সিজার দিয়েই তাঁর মায়ের ভাঙা পায়ের সেলাই কেটেছিলেন। সিজারটি অবশ্য সেদিন ফেরত দিয়েছিলেন সন্দীপ।

বুধবার তাঁকে সাসপেন্ড করেছে চিকিৎসক সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থপেডিক ডিপার্টমেন্টের প্রধান ছিলেন। বহরমপুরের একাধিক নার্সিংহোমের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কে কে ব্যানার্জী রোডের একটি ওষুধের দোকানে তাঁর চেম্বার ছিল। সেই দোকানের আগের মালিক চন্দন ঘোষ বললেন, “ব্যবহার কিন্তু ভাল ছিল। চিকিৎসাও ভাল করতেন। যত গন্ডগোল হল কলকাতায় যাওয়ার পর। যা শুনছি তা মেনে নিলে ওই চিকিৎসকের প্রতি ঘেন্না লাগছে। বিশ্বাস হচ্ছে না এই সন্দীপ ঘোষই সেই সন্দীপ ঘোষ কি না?”
চেম্বার লাগোয়া ৪৩ আলেপ খাঁ মহল্লায় একটি দু-কামরার ফ্ল্যাট ও কিনেছিলেন সন্দীপ । বাসিন্দা তালিকায় এখনও জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। সবিতা রেসিডেন্সির ৪ইতে ২০১৯ সাল থেকে অবশ্য তালাই ঝুলছে বলে জানালেন রেসিডেন্সির বাসিন্দা নুরুল মল্লিক। তিনি বলেন ” আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতেন। চিকিৎসার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে দিতেন। আমি জানি না উনি সত্যিই দোষী কি না। এটা ভাবতেই অবাক লাগছে এতবড় কান্ডে সেই চিকিৎসক সন্দীপ ঘোষই জড়িত। সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছে না।”